অনলাইন প্রতিবেদক : নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত প্রচারণা আচরণবিধি ভঙ্গের সামিল। তবে সেই বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যানারে, বক্তৃতা ও পরিচয়ে প্রার্থিত্ব তুলে ধরে কৌশলে প্রচারণা চালালেন দুই ভাই। দুইজনই জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী।
আলোচিত দুই ভাই হলেন মাসুদ সাঈদী ও শামীম সাঈদী।
মাসুদ সাঈদী পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানি) আসন এবং শামীম সাঈদী পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-স্বরূপকাঠী) আসনে দলের ঘোষিত প্রার্থী। তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতের শীর্ষ নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে।
নাজিরপুরে ‘কার্যালয় উদ্বোধন’
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সকাল ১১টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুরে রিকশা ও ভ্যান শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কার্যালয় উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে মাসুদ সাঈদীর নাম লেখা হয় ‘জামায়াতে ইসলামী মনোনীত, ইসলামী ও সমমনা ৮ দল সমর্থিত জাতীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী’ হিসেবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়নের সভাপতি মাহফুজুর রহমান।
ব্যানারে স্থান উল্লেখ ছিল নাজিরপুর আলিয়া মাদরাসা চত্বর। তবে আলোচনাসভা হয় বাজারের টলঘরে। শনিবার ছিল সাপ্তাহিক হাটের দিন।
সকাল থেকেই টলঘরে দোকান বসানো থাকায় অনুষ্ঠানের কারণে দোকানি ও ক্রেতাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তবে এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।
ইউনিয়নের সভাপতি মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মাসুদ সাঈদী শুধু কার্যালয় উদ্বোধন করেছেন। তিনি (মাসুদ সাঈদী) তাঁর বক্তব্যে ভোট চাননি। এমনকি কোনো বক্তাও মাসুদ সাঈদীর জন্য ভোট চাননি।
এটা কোনো নির্বাচনী প্রচারণা নয়। শুধু ইউনিয়নের কার্যালয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী প্রতীকও ব্যবহার করেননি।
সরকারি জমি ও টলঘর ঘিরে বিতর্ক
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চারদলীয় জোট সরকারের সময় সরকারি জমিতে নাজিরপুর আলিয়া মাদরাসা গড়ে ওঠে। শুরুতে পাঠাগার নামে অস্থায়ী টিরশেড ঘর ছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাজারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অদিদপ্তরের অর্থায়নে টলঘর নির্মাণের সময় তিনটি ঘর অপসারণ করা হয়। সরকারের পতনের পর টলঘরের পাশে আবার টিনের বড় ঘর তোলা হয়।
এ নিয়ে সাবেক মন্ত্রী শম রেজাউল করীমের ভাই নূরে আলম সিদ্দিকী শাহীনকে প্রধান আসামি করে মাদরাসা ও পাঠাগার ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। যদিও নূরে আলম সিদ্দিকী শাহীনের দাবি, সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা জামায়াতের পরিত্যক্ত দলীয় কার্যালয়টি সরকারই নিজেদের প্রয়োজনে ভেঙে ফেলেছিল। তখন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকায় আমাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদরাসার সাইনবোর্ড ও নতুন টিনশেড ঘরে পাঠাগার কার্যক্রমের আড়ালে জামায়াতের দলীয় কার্যক্রম চলে। মাসুদ সাঈদী ওই টিনশেড ঘরের নির্মাণকালেও দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেই সময়ের ছবিও সংরক্ষিত রয়েছে।
স্বরূপকাঠীতে ‘ভবন’ উদ্বোধন
পিরোজপুর-২ আসনে প্রার্থী শামীম সাঈদী শুক্রবার স্বরূপকাঠী পৌর এলাকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করেন। সম্প্রতি কেনা ১৫ শতাংশ জমিতে তাঁর বাবার নামে প্রস্তাবিত ‘আল্লামা সাঈদী ভবন’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এখানেই অস্থায়ীভাবে উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচনী কার্যালয় করার প্রস্তুতি রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিদেশি কয়েকজন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। পাশের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন তাঁরা। নামাজে ইমামতিও করেন একজন অতিথি। সেখানেও শামীম সাঈদীকে জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা মুঠোফোনে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী নিজ প্রতীক ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। এ সময় সরকারি কোনো স্থাপনাও ব্যবহার করা যাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
সাজিয়া শাহনাজ তমা আরো বলেন, আচরণবিধি ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মাসুদ সাঈদীর ক্ষেত্রে এমন কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।