নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) আইফোনের জন্য নয়, বরং পাওনা ৫ হাজার টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। এ ঘটনায় গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ-সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত এক কিশোর। অপ্রতিম তাকে ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সেই টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। টাকা ফেরত দিতে না চাইলে অপ্রতিমকে হত্যার চিন্তা ওই কিশোরের মধ্যে তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।
তবে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনেরও দীর্ঘদিনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল বলে জানা গেছে। স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘কিং অব কোটবাড়ি’র সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্যও উঠে এসেছে।
তুহিনের সঙ্গে লালমাই পাহাড়ে অপ্রতিম
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পাওনা ৫ হাজার টাকা ফেরত নিতে তুহিনের সঙ্গে দেখা করে অপ্রতিম। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে তুহিন তাকে লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
তুহিন টাকা দিতে পারবে না বলে জানালে অপ্রতিম তাকে ধাক্কা দেয়। পরে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথার পেছনে কয়েকবার আঘাত করে। এ সময় ঘটনাস্থলে আরও তিন থেকে চারজন উপস্থিত ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।
আঘাতে অপ্রতিম আহত হয়ে পড়লে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে আইফোন নয়, ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে বিরোধের তথ্যই পাওয়া গেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অপ্রতিমের সম্পৃক্ততা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার এক কিশোর ঘটনার ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার দোকানে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘কিং অব কোটবাড়ি’ কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্যের দাবি, প্রায় এক মাস আগে দোকানে কাজ করার সময় তুহিন নেশা করার জন্য অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের এক বছর ধরে পরিচয় ছিল। তারা নিয়মিত অপ্রতিমদের বাসায় পার্টির আয়োজন করত এবং মোটরসাইকেল নিয়ে লালমাই পাহাড় এলাকায় ঘুরতে যেত।
ওই সদস্যের ভাষ্য, স্থানীয় কিশোর গ্যাং ‘কিং অব কোটবাড়ি’র নেতৃত্বে ছিল তুহিন। অপ্রতিমও নিয়মিত ওই গ্রুপের আড্ডায় অংশ নিত। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে গ্রুপটির অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রুপটির একাধিক ছবিতে অপ্রতিমকে দেখা গেছে। মোটরসাইকেল নিয়ে আয়োজিত মহড়াতেও তার উপস্থিতির ছবি রয়েছে।
গ্রুপটির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন ওই সদস্য। তার দাবি, পার্টির কথা বলে ওই নেতা মোটরসাইকেল মহড়ার আয়োজন করতেন। তবে এসব তথ্যের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জিজ্ঞাসাবাদে তুহিনের সম্পৃক্ততার তথ্য
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়ার সময় কর্মকর্তারা জানতেন না অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। তবে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। যদিও অন্য সহযোগীদের নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে সে ‘ওয়াদাবদ্ধ’ ছিল বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তুহিনের মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল। ফোনে কল করা ব্যক্তিদের মধ্যে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোরও ছিল। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে ওই কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়। সে সময় তার পরনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
প্রতিশোধের যোগসূত্র খতিয়ে দেখার দাবি
অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। এ ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে এসব তথ্য জানান ড. কামরুন নাহাত শীলা।
তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম চান, পুলিশ তদন্ত করে বিষয়টি বের করুক— আগের ওই ঘটনার প্রতিশোধের জেরেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না।’
২২ ঘণ্টা পর উদ্ধার অপ্রতিমের মরদেহ
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরে শনিবার বেলা ১টার দিকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।