1. diggilseba@gmail.com : admin :
  2. ashadul@barisalcrimetrace.com : Ashadul Islam : আসাদুল ইসলাম
  3. hafiz@barisalcrimetrace.com : barisal CrimeTrace : barisal CrimeTrace
  4. mahadi@barisalcrimetrace.com : মাহাদী হাসান : মাহাদী হাসান
নৌ অ্যাম্বুলেন্স আছে, তবু হাসপাতালে যেতে ট্রলারই ভরসা চরবাসীর - বরিশাল ক্রাইম ট্রেস
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

নৌ অ্যাম্বুলেন্স আছে, তবু হাসপাতালে যেতে ট্রলারই ভরসা চরবাসীর

  • আপডেট সময় : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: “স্যার শুনছি আমাগো চরের গরীব অসহায় রোগীদের হাসপাতালে নিতে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিছে, কিন্তু কোন সময় নৌ অ্যাম্বুলেন্স চোখে দেখি নাই। এমনকি কোন রোগীকে হাসপাতালে নিতেও দেখি নাই, তাহলে সরকার এটা কেনো দিলো।”

কথাগুলো ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চর জহিরউদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা বিউটি বেগম ও আরজু আক্তারের। সরেজমিনে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও নৌ অ্যাম্বুলেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তারা।

বিউটি বেগম জানান, তার বিয়ে হয়েছে প্রায় ৩৫ বছর আগে। তার স্বামী পেশায় একজন জেলে। আরজু আক্তারের বিয়ে হয়েছে প্রায় ১০ বছর আগে। তার স্বামীও জেলে ও দিনমজুরের কাজ করেন। বিয়ের পর থেকেই তারা স্বামীদের সঙ্গে চর জহিরউদ্দিনে বসবাস করছেন।

দুই গৃহবধূ জানান, বিচ্ছিন্ন চরে বসবাস করায় তাদের জীবন অনেক কষ্টের। তবে অসুস্থ হলে সেই কষ্ট আরও বেড়ে যায়। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

তারা জানান, প্রায় ৬-৭ বছর আগে চরাঞ্চলের রোগীদের তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার জন্য সরকার নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে বলে শুনেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত চর জহিরউদ্দিন থেকে কোনো রোগীকে ওই অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে যেতে দেখেননি।

তাদের ভাষ্য, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে খেয়া ট্রলার ব্যবহার করতে হয়। কখনও দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে ট্রলার রিজার্ভ করে হাসপাতালে যেতে হয়। এতে অনেক সময় ঋণের বোঝাও বইতে হয়।

প্রসববেদনায়ও ভরসা ট্রলার

চর জহিরউদ্দিনের বাসিন্দা ইউসুফ হোসেন ও কবির মাঝিও জানান, সরকার নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে শুনেছেন, কিন্তু সেটিকে কখনো রোগী নিতে বা আনতে দেখেননি।

তাদের ভাষ্য, চরে প্রায় ৭-৮ হাজার মানুষের বসবাস হলেও সেখানে কোনো হাসপাতাল নেই। বাজারের কয়েকটি ফার্মেসি থেকেই সাধারণ জ্বর-সর্দির ওষুধ কিনে খেতে হয়। জটিলতা বাড়লে তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়।

চরে হাসপাতাল না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন গর্ভবতী নারীরা। গৃহবধূ বিলকিছ বেগম বলেন, প্রসববেদনা উঠলে ট্রলার ভাড়া করে তজুমদ্দিন কিংবা ভোলায় যেতে হয়। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে হঠাৎ করে ট্রলারের টাকা জোগাড় করাও কঠিন।

তিনি বলেন, “ওই সময় স্থানীয়দের কাছে থেকে ধার-দেনা ও সুদের উপর টাকা নিয়ে চর জহিউদ্দিন থেকে ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে উত্তাল মেঘনা নদীর পার হয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বা রোগী বেশি খারাপ হলে ভোলা সদর হাসপাতালে নিতে হয়।”

সন্ধ্যার পর অনেক সময় ট্রলার পাওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রোগীকে দেরি করে হাসপাতালে নেওয়ার কারণে অনেক সময় গর্ভবর্তীরা নারীরা বাড়ি ও চর জহিরুদ্দিন থেকে ট্রলারে হাসপাতালে নেওয়ার পথে নদীতেই মারা যায়।”

চর মোজাম্মেলেও একই দুর্ভোগ

চর জহিরউদ্দিনের মতো একই চিত্র তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চর মোজাম্মেলেও। সেখানে প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের বসবাস। চরটির বাসিন্দা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, চর মোজাম্মেল তজুমদ্দিন উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতিদিন খেয়া ট্রলারে যাতায়াত করতে হয়।

তিনি জানান, কোনো শিশু, নারী বা পুরুষ অসুস্থ হলে তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করা খেয়া ট্রলার ছাড়া রোগী হাসপাতালে নেওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা নেই।

সকালে ও দুপুরে ট্রলার চলাচল করে। খেয়া পারাপারের সময় শেষ হয়ে গেলে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলেও দাবি তার। হুমায়ুন কবির বলেন, এতে অনেক রোগী বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। তাদের মধ্যে গর্ভবতী নারীর সংখ্যাও বেশি। কেউ ধারদেনা করে ট্রলার রিজার্ভ করতে পারলেও খরচ হয় দুই-তিন হাজার টাকা এবং সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

তার ভাষ্য, নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালু থাকলে ১৫-২০ মিনিটেই হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হতো। সরকার এত টাকা খরচ করে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার দরকার কি ছিল”- এমন প্রশ্ন তুলে ওই এলাকার গৃহবধূ নাজমা বেগম দাবি করেন, “সরকার নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে চরাঞ্চল থেকে রোগীদের দ্রুত তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে কিন্তু সেটা তো কখন নিতে দেখিনি।” চর মোজাম্মেলের বাসিন্দা মো. মিরাজ উদ্দিন বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স আছে কিন্তু কখন রোগী নেয়নি। এটা দিয়ে আমাদের চরের মানুষের লাভ কি হলো।”

সরকারের ৩০ লাখ টাকা পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “অথচ আমরা চরাঞ্চলের গরীব ও অসহায় মানুষ রোগীকে হাসপাতালে নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলারের জন্য বসে থাকি। তিনি দ্রুত নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি মেরামত করে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি বেসড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেয় সরকার। ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি অ্যাম্বুলেন্সটি তজুমদ্দিন হাসপাতালে হস্তান্তর করা হয়। এর বরাদ্দ মূল্য ছিল ৩০ লাখ টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তজুমদ্দিন উপজেলার স্লুইস ঘাট এলাকার মেঘনা নদীর তীরবর্তী একটি বন্ধ খালে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে সরকারি নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি।

বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় কাদা-পানিতে আটকে এটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুরো বডিতে মরিচা ধরার পাশাপাশি শ্যাওলা জমেছে। এছাড়াও জানালার কাচ ভাঙা, ভেতরে জমেছে কাদা ও আবর্জনা। ‘বিকল’ হয়ে পড়েছে ইঞ্জিনও।

এ বিষয়ে ভোলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম জানান, যে প্রকল্পের আওতায় নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তেলের বরাদ্দ নেই।

প্রকল্প চালু থাকাকালেও চালক দেওয়া হয়নি। এ কারণে অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করা সম্ভব হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে তজুমদ্দিনের নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির মেশিন পুরোপুরি বিকল।

এটি সচল করা কঠিন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুন আধুনিক নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার আশ্বাসও পাওয়া গেছে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স পেলে চরাঞ্চলের রোগীরা এর সুফল পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
© All rights reserved © 2025 Barisal Crime Trace
Theme Customized By Engineer BD Network