নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বরগুনার তালতলীতে পায়রা (বুড়িশ্বর) নদীতে খাবারের উচ্ছিষ্ট, পশুর নাড়িভুঁড়ি, পচা সবজি, পলিথিন, প্লাস্টিক ও কাচের বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
দিনের বেলায় বর্জ্য একটি ঘরে জমিয়ে রেখে গভীর রাতে নদীতে ফেলা হয় বলে দাবি স্থানীয় জেলেদের। এ ঘটনায় নদীর পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে নদীতীরে মানববন্ধন করেছেন দুই শতাধিক বাসিন্দা ও জেলে। অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের জয়ালভাঙ্গা এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসংলগ্ন পায়রা নদীর তীরে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটি।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব মো. বাবুল হাওলাদার, কামাল চৌকিদার, সুলতান মিয়াসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বরিশাল ৩৫০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পায়রা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে খাবারের উচ্ছিষ্ট, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি, পচা সবজি, পলিথিন, প্লাস্টিক, বিয়ারের ক্যান ও কাচের বোতল রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, দিনের বেলায় এসব বর্জ্য একটি ঘরে জমিয়ে রাখা হয়। পরে গভীর রাতে সেগুলো নদীতে ফেলা হয়। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হলেও বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়নি বলে দাবি তাদের।
জেলেরা বলেন, নদীতে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হলে পানির গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। এতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা হুমকিতে পড়তে পারে। নদীতীরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্জ্য শোধন ও ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। তাদের প্রশ্ন, বর্জ্য শোধনাগার না থাকলে পরিবেশগত ছাড়পত্র কীভাবে দেওয়া হয়েছে? আর থাকলে সেটি কার্যকর কি না এবং ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে কি না।
পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী পৃথক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য শোধনের জন্য উপযুক্ত শোধনাগার প্রয়োজন। অন্যদিকে, খাবারের উচ্ছিষ্ট, পশুর নাড়িভুঁড়ি, পলিথিন ও কাচের বোতলের মতো কঠিন বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপদ স্থানে অপসারণ করতে হয়।
এসব বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নদীতে ফেলা হলে পানির গুণগত মান ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে পায়রা নদীর জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জেলেদের জীবিকায়।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনুমোদিত পরিকল্পনা, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত এবং বাস্তবে বর্জ্য কোথায় ও কীভাবে অপসারণ করা হচ্ছে, তা সরেজমিনে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মিরাজ হাওলাদার বলেন, জেলে ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন তাদের ডেকেছিল। পরে তারা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছেন, নদীতে আর বর্জ্য ফেলা হবে না। তিনি বলেন, এরপর থেকে বর্জ্য গাড়িতে করে আমতলী পৌরসভার নির্ধারিত ময়লা ফেলার স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ নষ্ট করে ও নদীর পানি দূষিত করে কাউকে কোনো ধরনের অপকর্ম করতে দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা বলছেন, শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্যের উৎস শনাক্ত, নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষা, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত পর্যালোচনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।