নিজস্ব প্রতিবেদক: বরিশাল বিভাগজুড়ে ক্রমশ ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। এরই মধ্যে রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিন হাজার। যার মধ্যে শুধুমাত্র চলতি জুলাই মাসের গত ২৬ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৫০ জন। সবশেষ শনিবার (২৫ জুলাই) একজন নিয়ে চলতি মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে পিরোজপুর এবং ঝালকাঠি জেলা ডেঙ্গুর হটস্পটের দিকে যাচ্ছে। কেননা এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করা পাঁচজনসহ আক্রান্ত বেশিরভাগ এই দুই জেলার বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্ষা মৌসুম ঘিরে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। এজন্য মশক নিধনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা প্রশাসনের জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। মশা নিধন এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে পারলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
তবে প্রকোপ বাড়তে শুরু করলেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় জেলাগুলোয় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ আক্রান্ত রোগী এবং তাদের স্বজনদের। এমনকি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশাল জেনারেল হাসপাতালেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। সাধারণ রোগীর সঙ্গেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তাদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ৩ হাজার ৫৬৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে। এর মধ্যে শুধু চলতি মাসেই ২৬ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগে ১ হাজার ৪৫০ জন রোগী আক্রান্ত হয়েছে।
এখন পর্যন্ত বিভাগে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জুলাই রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় রূপালী আক্তার (২৬) নামের নারীর। তিনি ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালী গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী। ২৫ জুলাই বিকেলে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর আগে ২৪ জুলাই মৃত্যু হয় ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ভরূপপাশ গ্রামের মো. মিজানের স্ত্রী মুন্নি আক্তারের (৩৫)।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর এবং ঝালকাঠি জেলায়। এর মধ্যে পিরোজপুরে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১০০৬ ও ঝালকাঠিতে ৯২২ জন আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে তারা সবাই পিরোজপুর ও ঝালকাঠির বাসিন্দা ছিলেন। এর মধ্যে একজন পিরোজপুর এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছে বরিশাল শেল-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
এ ছাড়া বরিশাল জেলায় ৪৫৭ জন, পটুয়াখালী জেলায় ৪১০ জন, ভোলায় ১৩১ জন এবং বরগুনা জেলার হাসপাতালগুলোতে ৪০৬ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এর বাইরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪৫ এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বরিশাল সিটিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার এখনো শূন্যের কোটায়। বর্তমানে ২৪০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে। বাকি ৩৩২২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
রোববার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, চলতি বছরের গত ৬ মাসে এ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে চার জনের। চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগ পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য গেলে তাদের এই হাসপাতালে পাঠান সেখানকার চিকিৎসক।
চিকিৎসাধীন রোগী পিরোজপুরের নেছারাবাদের বাসিন্দা হালিমা খাতুন (৩৮) বলেন, মশার ওষুধ কী জিনিস, তা আমরা জানি না। বছর বছর ডেঙ্গু জ্বরে এত মানুষ আক্রান্ত হয়; কিন্তু আমাদের এলাকায় মশার ওষুধ দিতে দেখি না।
অন্যদিকে ঝালকাঠি পৌর শহরের কাঠপট্টি এলাকা থেকে শেবাচিম হাসপাতালে মেয়ের চিকিৎসা করাতে আসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে; কিন্তু এলাকায় ডেঙ্গু বিরোধে পৌরসভা বা স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখছি না। বৃষ্টি হয়ে রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনায় পানি জমে থাকছে, তা অপসারণে পৌরসভার উদাসীনতা রয়েছে।
পিরোজপুরের রেজাউল করীম বলেন, আমার জন্মের পর দু-একবার দেখেছি মশার ওষুধ দিতে। আমাদের এলাকায় কোনো পরিষ্কার বা মশার ওষুধ দেওয়া হয় না। আমি আক্রান্ত হয়েছি। আরও অনেকে আক্রান্ত হয়েছে।
বেতাগী উপজেলার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, আমাদের বরগুনায় অনেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। আমার ভাতিজাও ডেঙ্গু আক্রান্ত। বেতাগীতে কেউ ওষুধ ছিটায় না। আমার দাবি যাতে নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয়।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আব্দুল মুনায়েম সাদ বলেন, এখন বর্ষাকাল হওয়ায় বৃষ্টি বেড়ে গেছে। এই সময়টায় প্রতি বছরই রোগীর সংখ্যা বাড়ে। মানুষের সচেতনতা আর ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে রোগী বাড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে আগে ৪টি মেডিসিন ইউনিট ছিল; এখন সেটা বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়েছে। আলাদাভাবে ওয়ার্ড করা সম্ভব না হলেও প্রতিটি ওয়ার্ডেই ডেঙ্গু কর্ণার করা হয়েছে। রোগীদের মশারি নিচে রাখার কথা বললেও অনেকে এটা নিয়ে সচেতন না। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, এখন বৃষ্টির সিজন অনেক, বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টির জন্য বিভিন্ন জায়গায় পানি জমেছে। জমে থাকা পানিতেই এডিস মাশা ডিম পাড়ে এবং লার্ভার জন্ম নেয়। যার কারণে এখন ডেঙ্গু একটু বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডা. লোকমান হাকিম বলেন, বিশেষ করে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায় রোগী সংখ্যা বাড়ছে। মশা নিধনের জন্য দায়িত্ব হচ্ছে স্থানীয় সরকারের। আর চিকিৎসকদের দায়িত্ব হলো রোগী আক্রান্ত হলে সেবা দেওয়া। মশা না মারলে এগুলো আরও ছড়িয়ে পড়বে তাই পৌরসভার উচিত মশা ছেটানো না হলে আরও বাড়বে।