নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল :: রাজধানীর বাজারগুলোতে গত ছয় মাসের ব্যবধানে নিত্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ডিম, মুরগি ও মাছের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে বেশি দামেই ডিম ও মুরগি বিক্রি হচ্ছে। এর আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০-১৮০ টাকা। আর ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ছিল ১৩০-১৪০ টাকা। আগস্টের শুরুতে পণ্য দুটির দাম বাড়ে; এরপর আর কমেনি।
বর্তমানে এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
ছয় মাস আগে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় বেশির ভাগ সবজির দাম তুলনামূলক কম ছিল। এখন মৌসুম পরিবর্তনের কারণে কিছু সবজির দাম বেড়েছে।
বাজারে দেখা যায়, বর্তমানে লম্বা বেগুন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চের শুরুতে বেগুনের দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। অর্থাৎ ধরনভেদে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
ছয় মাস আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে করলার দাম। এটি বিক্রি হচ্ছে এখন ৮০ টাকা কেজি দরে; যা মার্চে ছিল প্রায় ১০০ টাকা। আর বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। ছয় মাস আগে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় এর দাম তুলনামূলক কম ছিল।
হাইব্রিড জাতের শসা বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, আর দেশি শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। মার্চে হাইব্রিড শসার দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। টমেটোর দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এখন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও মার্চে ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা।
আগাম শিমের দাম এখন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। মার্চে সরবরাহ বেশি থাকায় এর দাম কম ছিল। পটোল, ঢ্যাঁড়স, কাঁকরোলসহ কয়েক ধরনের সবজি বর্তমানে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা ছয় মাস আগে কম ছিল।
পেঁপের দাম অবশ্য প্রায় একই রয়েছে। এখন প্রতিকেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে। বর্তমানে ১৬০ টাকা কেজি, গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকা। মার্চের শেষ দিকে কাঁচা মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
শাকের বাজারেও দামে পার্থক্য রয়েছে। লাল শাক ও কলমি শাক ২০ টাকা আঁটি, ডাঁটা শাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লাউ শাক ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচু শাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা আঁটি বিক্রি হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমভেদে এ সবজির দামে ওঠানামা থাকে। বিক্রেতারা বলছেন, গত পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও গরমে অনেক খামারে ডিম পাড়া মুরগিসহ ব্রয়লার মুরগি মারা যায়। পরে অনেক খামারি নতুন করে আর মুরগি পালন শুরু করেননি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণেও খামারে মুরগি পালন কমেছে। এসব কারণে বাজারে ডিম-মুরগির দাম কিছুটা বেশি।
গত সপ্তাহের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকার মতো বেড়েছে। গতকাল প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩৪০-৩৬০ টাকা। অবশ্য হাইব্রিড সোনালি বা কালারবার্ড মুরগির দাম কিছুটা কম, কেজি ৩০০-৩৩০ টাকা।
দীর্ঘ সময় ধরে ডিম ও মুরগির দাম না কমায় উদ্বেগ জানান রাজধানীর তাজমহল রোডের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার আয় কম। মাংসের মধ্যে মুরগিই মূলত কেনা হয়। সেটির দামই কমছে না।’
মাছের বাজারে ছয় মাসের ব্যবধানে বেশ কিছু মাছের দাম বেড়েছে। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে ছিল ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। পাঙাশ এখন ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, মার্চে ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।
রুই-কাতলার দাম বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। মার্চে আকারভেদে রুই মাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ছিল। তবে মাঝারি আকারের রুই এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, যা ছয় মাস আগেও প্রায় একই ছিল। বড় রুইয়ের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
চিংড়ি বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি। ছয় মাস আগে তুলনামূলক কম ছিল। তবে আকার ও মানভেদে এ মাছের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, যা ছয় মাস আগেও প্রায় একই দামে ছিল। টেংরা প্রায় ৭০০ টাকা, ছয় মাস আগে আকার ও ধরনভেদে দাম কম ছিল।
২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে।
মাসখানেক আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ১০৫-১১০ টাকা। গতকাল তিনটি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, খুচরা দোকানে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর মোড়কজাত চিনির কেজি ১২০ টাকা।
বাজারে পোলাও চাল বা সুগন্ধি চালের দাম এখনো ২০০ টাকার আশপাশে। সম্প্রতি পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছিলেন, সুগন্ধি চাল রপ্তানির উন্মুক্ত সুযোগ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ সংকট থেকে দাম বাড়তি। এ জন্য তাঁরা রপ্তানি কমানোর দাবি জানান। এরপর গত মঙ্গলবার সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সবজির দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বেশির ভাগ সবজির কেজি এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। ১০০ টাকার ওপরে দাম রয়েছে বরবটি, বেগুন ও কাঁচা মরিচের।
টাউন হল বাজারের ক্রেতা আবির হাকিম বলেন, ছয় মাসে বাজারের চিত্র বদলে গেছে। কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডিম, মাছ ও বেশির ভাগ সবজির দাম এখনও নাগালের বাইরে। ছয় মাস আগে ৫০০ টাকা দিয়ে কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা গেলেও এখন একই টাকায় তা সম্ভব হয় না। চাল, ডালসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে ছয় মাসের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে ডিম ও মৌসুমি কয়েক ধরনের সবজির দামে। কয়েক ধরনের মাছের দামও বেড়েছে। মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও গরুর মাংসের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে কিছু পণ্যে দাম স্থির থাকলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের বাজারের চাপ কমেনি।