নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো দেখিয়ে আসা গাইবান্ধার ‘এক টাকার শিক্ষক’ লুৎফর রহমান এবার পেলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে বিশেষ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পান গাইবান্ধার লুৎফর রহমান।
দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা না করেও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। অর্থের অভাবে যাতে কোনো শিশু পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই নিজের উদ্যোগে এক টাকার বিনিময়ে পাঠদান শুরু করেন লুৎফর রহমান। এভাবেই এলাকায় তিনি পরিচিতি পান ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে।
অনুষ্ঠানে লুৎফর রহমান তার দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবার অভিজ্ঞতা ও নিজের কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হলেও এই প্রবীণ শিক্ষাব্রতীকে অবসরকালীন ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে নির্দেশনা দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী অনুষ্ঠানে অবসরভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি লুৎফর রহমানের দীর্ঘ শিক্ষাসেবাকে নতুন মর্যাদা দিয়েছে। যে মানুষটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবি বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে থেকেছেন, তার সেই নিরলস প্রচেষ্টাই এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃতি পেল।
লুৎফর রহমান দীর্ঘদিন ধরে গাইবান্ধার বাগুড়িয়া এলাকায় শিশুদের পড়িয়ে আসছেন। বর্তমানে প্রতিদিনও তিনি বহু শিশুকে পড়ান। তার কাছে পড়াশোনা করে বিভিন্ন প্রজন্মের শিক্ষার্থী নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে লুৎফর রহমানকে সম্মাননা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু একজন ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরে থেকেও সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে দীর্ঘদিন কাজ করে যাওয়া একজন শিক্ষাব্রতীর অবদানকেও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অবসরভাতা দেওয়ার নির্দেশ সেই স্বীকৃতিকে আরও অর্থবহ করেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ‘এক টাকার শিক্ষক’ লুৎফর রহমানের পাশে রাষ্ট্রের দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তার দীর্ঘ শিক্ষাসেবার প্রতি সম্মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
এদিকে সর্বমোট ১০২ জন সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকের তালিকায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষভাবে অবদান রাখা শিক্ষাব্রতীরাও ছিলেন।
অনুষ্ঠানে লুৎফুর রহমান ছাড়াও ‘রমনী কান্ত পাঠশালা’র রমনী কান্ত বেপারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় কাজ করা প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশনের সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খানকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয়।
এবারের সম্মাননার জন্য শিক্ষকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাছাই করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পৃথক বিচারক ও সার্চ কমিটি এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।