সাগরেই বিলীন হতে পারে ঘূর্ণিঝড় অশনি

Barisal Crime Trace -FF
প্রকাশিত মে ১০ মঙ্গলবার, ২০২২, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সাগরেই বিলীন হতে পারে ঘূর্ণিঝড় অশনি

ক্রাইম ট্রেস ডেস্ক : প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’। এটি রোববার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকটাই প্রবল বেগে উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর গতি কিছুটা কমে যায়। যতই উপকূলের কাছাকাছি হবে ততই এর গতি আরও কমতে পারে। আজ দুপুর নাগাদ এর অগ্রভাগ পৌঁছাতে পারে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তমে। ওড়িশার দিকেও ঘোরার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে যেদিকেই যাক না কেন, স্থলভাগে এটি আর ঘূর্ণিঝড় আকারে উঠছে না-সেটি বলছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা মনে করেন, অশনির সমাধি ঘটবে সাগরেই। আর গভীর নিম্নচাপ আকারে তা স্থলভাগে উঠবে। এতে ভারতের অন্ধ্র, ওড়িশা আর পশ্চিমবঙ্গ প্রচুর বৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ মোংলা, খুলনা, সাতক্ষীরায় বাতাসের ঝাপটা আর ঢেউয়ের ধাক্কা লাগতে পারে। তবে সেটা বড় আকারের কিছু নয়। বাংলাদেশেও অশনির থেকে কিছু বৃষ্টি পাবে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সাগরের ঢেউয়ের বড় অংশ এবারও সুন্দরবন মোকাবিলা করবে।

এদিকে অশনির প্রকোপ না পড়লেও বাংলাদেশ সরকার সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। ইতোমধ্যে উপকূলে স্বেচ্ছাসেবীরা মাইকিং করেছেন। ঘূর্ণিঝড়ের খবরে সাতক্ষীরা ও খুলনার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কেননা সিডর-আইলা আর ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের দগদগে ক্ষত এখনো ওইসব এলাকায় জ্বলজ্বলে। ফলে নতুন ঘূর্ণিঝড়ে আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রাসমুদ্রকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। উপকূলের দিকে রওনা হয়েছে শত শত মাছ ধরা ট্রলার। নোয়াখালীর হাতিয়ার সঙ্গে সারা দেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানায়, রোববার রাতে অশনির গতি ছিল ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার। পরে সোমবার দুপুর পর্যন্ত এটি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার করে আগায়। রোববারই এটি ব্যাপক শক্তি সঞ্চয় করেছিল। যে কারণে ধীরে ধীরে এটি বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। আন্দামান সাগরের কাছে এটি গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সোমবার সকালে এর কেন্দ্রের গতি ছিল ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত। পরে তা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১১৭ কিলোমিটার ছিল। শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় তা তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছিল। তবে এরপর ঝড়ের গতি ও শক্তি কমতে শুরু করে। উপকূলের কাছে পৌঁছানোর আগে আরও শক্তি ক্ষয় হবে ‘অশনি’র। এতে এটি অন্ধ্র উপকূলে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়রূপে পৌঁছাতে পারে। তখন এর বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ থাকতে পারে ৭৫ থেকে ৯৫ কিলোমিটার।

আবহাওয়াবিদরা বলেন, আজ সারাদিন সাধারণ ঘূর্ণিঝড় আকারেই থাকতে পারে এটি। কাল রাতে পরিণত হতে পারে গভীর নিম্নচাপে, যার প্রক্রিয়া শুরু হবে বেলা ১২টার পরে। ওড়িশার দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হলেও আবহাওয়াসংক্রান্ত ওয়েবসাইট উইন্ডডটকমের মডেল বলছে, এটি বিশাখাপত্তম দিয়ে স্থলভাগে উঠতে পারে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম  বলেন, আসলে সাগরে থাকাকালে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে শতভাগ পূর্বাভাস করা সম্ভব নয়। কেননা ঘড়ির উল্টোদিকের হিসাবে চলায় এটি যে কোনো সময়ে যে কোনো দিকে ঘুরে যেতে পারে। যদিও বিভিন্ন সংস্থার মডেল বলছে, বিশাখাপত্তমেই অশনির শেষ হবে। কিন্তু কোনো কারণে ঘুরে গেলে তা শেষপর্যন্ত পুরীর উপকূল হয়ে ভুবনেশ্বরে প্রবেশ করতে পারে। সেক্ষেত্রে নিম্নচাপ আকারে এটি পশ্চিমবঙ্গের উপকূলেও প্রবেশ করতে পারে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, অশনি সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি মোংলা থেকে ৯৮০ কিলোমিটার দূরে ছিল। আর চট্টগ্রাম থেকে ১১০০ ও কক্সবাজার থেকে ১০৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল। এটি আরও উত্তর-পশ্চিমে অগ্রসর হতে পারে।

বিএমডি যে ৪২ স্টেশনের তথ্য প্রকাশ করেছে তার মধ্যে রাজশাহী বাদে আর সব বিভাগেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বরগুনার খেপুপাড়ায় ২০১ মিলিমিটার। চট্টগ্রাম বিভাগেও ব্যাপক বৃষ্টি হয়। সন্ধ্যায় ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে বলা হয়, রাত ১টা পর্যন্ত আকাশ মেঘলা থাকতে পারে। অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৬০-৮০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়োহাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যত্র ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। এসব এলাকার নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বরিশাল ও আগৈলঝাড়া : ঘূর্ণিঝড় অশনি মোকাবিলায় বরিশাল বিভাগের ২০ লাখ মানুষের নিরাপদে অবস্থানের জন্য চার হাজার ৯১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভাগের উপকূলীয় এলাকাগুলোকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা সব প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনার ও বরিশাল জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে সোমবার সকালে এ তথ্য জানা গেছে। বরিশাল জেলায় এক হাজার ৭১টি, পটুয়াখালীতে ৯২৫টি, ভোলায় এক হাজার ১০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও পিরোজপুরে ৭১২টি ও ঝালকাঠিতে ৪৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে ২০ লাখ মানুষের পাশাপাশি কয়েক লাখ গবাদিপশুও রাখা যাবে।

বরগুনা ও পাথরঘাটা : উপকূলের দিকে রওনা হয়েছে শত শত মাছ ধরা ট্রলার। ইতোমধ্যেই কয়েকশ’ ট্রলার বলেশ্বর নদ ও সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। অশনির প্রভাবে পাথরঘাটায় সোমবার সকাল থেকে ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টি হচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করেছে কৃষক। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন উপকূলবাসী। বরগুনায় ৬২৯ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পটুয়াখালী, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা : পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, অশনির প্রভাবে এ অঞ্চলের উপকূলে মৃদু প্রভাব পড়তে পারে। পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ সবকটি সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলার নিরাপদে যেতে বলা হয়েছে। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, জেলেদের ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে জেলেদের জানিয়ে দেওয়া হবে। রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, সতর্কসংকেত বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হবে। আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

পিরোজপুর, নাজিরপুর ও ভাণ্ডারিয়া : নাজিরপুরের কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। উপজেলায় চলতি বছরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও ধান ঘরে তুলতে পারেননি অধিকাংশ কৃষক। ভাণ্ডারিয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা দিতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম ও ফায়ার সার্ভিস প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

ভোলা : অশনিতে আটকে পড়ার ভয়ে বাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের শ্রমজীবীরা। ঈদ উপলক্ষ্যে কমপক্ষে তিন লাখ শ্রমজীবী ভোলা জেলার ৭ উপজেলার নিজ বাড়িতে আসেন। ঝড়ের কারণে দীর্ঘ সময় আটকে যেতে পারেন ভেবেই এরা কর্মস্থলে ফিরে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ২ নম্বর সতর্কসংকেত উপেক্ষা করেই ভোলা-লক্ষ্মীপুর ও ভোলা-ঢাকা রুটে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায় লঞ্চ ও সি-ট্রাক।

নোয়াখালী : নদী উত্তাল থাকায় হাতিয়া দ্বীপের সঙ্গে সারা দেশের নৌচলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন হাতিয়া থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সোমবার সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নৌচলাচল বন্ধ রেখেছে।

কক্সবাজার : অশনির প্রভাবে কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি কক্সবাজার পর্যটন শিল্পে। অশনির খবরেও সোমবার লাখো পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। সাগর কিছুটা উত্তাল থাকলেও তা উপেক্ষা করে কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে উৎসব উল্লাসে মেতে উঠেছেন লাখো পর্যটক। এসব পর্যটক সোমবার ভোরেই কক্সবাজার এসেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে সোমবার মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বিকালে ও সন্ধ্যায় থেমে থেমে কখনো মুষলধারায় কখনো মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। এতে নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যায় অফিসফেরত লোকজনকে পড়তে হয় সীমাহীন দুর্ভোগে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]