আমলীতে অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে গেলেই কাটা পড়বে জঙ্গলের কয়েকশ গাছ!

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত জুন ২ বুধবার, ২০২১, ০৪:৫৬ অপরাহ্ণ
আমলীতে অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে গেলেই কাটা পড়বে জঙ্গলের কয়েকশ গাছ!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে গেলেই কাটা পড়বে জঙ্গলের কয়েকশ গাছ। ভাঙা পড়বে অভয়ারণ্যের পশু বেষ্টনি। সংরক্ষিত বন হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি রয়েছে সেতু পাড় হয়ে জঙ্গলে যানবাহনের অবাধ প্রবেশের আশঙ্কা। তার পরও ৭ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গা ঘেঁষে বিশাল এই সেতু নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সেতু নির্মাণের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি এলজিইডি। এমনকি সেতুর ডিজাইন প্ল্যানও দেখিনি আমরা। অপর দিকে এলজিইডির দাবি, সব কিছুই জানে বন বিভাগ। এখন যদি তারা বাগড়া দেয় তো সিদ্ধান্ত নেবে দুই দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলায় বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে অবস্থান টেংরাগিরি অভয়ারণ্যের। ১৩ হাজার একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক বনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে বহু বছর আগে। হরিণ, বানর, শূকর, শিয়াল, মেছোবাঘ, কুমির এবং বনমোরগসহ অসংখ্য প্রজাতির জীব আর উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রয়েছে এখানে। মাংসাশী ও নিরামিষভোজী প্রাণীসহ কুমিরের জন্য এই জঙ্গলে রয়েছে আলাদা আলাদা রক্ষা বেষ্টনি। অভয়ারণ্যে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য রয়েছে ইট দিয়ে তৈরি সরু রাস্তা।

স্থানীয় ট্যুরিজম উদ্যোক্তা আরিফুর রহমান বলেন, জীববৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডারের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার রক্ষাকবচ হিসাবেও ভূমিকা পালন করে টেংরাগিরি জঙ্গল। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ উপকূলে যতগুলো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে তার সবই বুক দিয়ে ঠেকিয়ে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা করেছে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল। তালতলীর ফকিরহাট ও টেংরাগিরির মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি সরু খাল জঙ্গলটিকে আলাদা করেছে লোকালয় থেকে।

অভয়ারণ্যের রক্ষাকবচ হিসাবেও বলা যেতে পারে এই খালটিকে। এ ছাড়া একদিকে সমুদ্র ও অন্যদিকে নদী ঘিরে রেখেছে এই বনাঞ্চল। পর্যটকদের জঙ্গলে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগে ফকিরহাটের খালে ছিল একটি সরু সেতু। সম্প্রতি এই ফকিরহাট খালে একটি বড় সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ফকিরহাটপ্রান্ত থেকে শুরু হয়ে সেতুটি ঢুকে যাবে টেংরাগিরি জঙ্গলে।

আর এই সেতু নির্মাণ নিয়েই দেখা দিয়েছে জটিলতা। ৭ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে চলছে ৭৭ মিটার দীর্ঘ্য এই সেতু নির্মাণের কাজ। যার দক্ষিণপ্রান্তের সর্বশেষ পিলারটি একেবারে জঙ্গল ঘেঁষে। জানা যায়, সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কের দৈর্ঘ্য ধরা আছে প্রায় ৪০ মিটার। সেতুর উত্তরপ্রান্ত নিয়ে কোনো জটিলতা না থাকলেও দক্ষিণপ্রান্তে জঙ্গলের অংশে ৪০ মিটার দৈর্ঘ্যরে অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে গেলে কাটতে হবে কয়েকশ গাছ। সেই সঙ্গে সংলগ্ন এলাকায় থাকা হরিণ ও বানরের বেষ্টনিও ভাঙতে হবে। এতে হুমকির মুখে পড়বে অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য।

বিশিষ্ট পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, পৃথিবীর কোথাও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে এভাবে স্থাপনা নির্মাণের নজির নেই। অভয়ারণ্যকে সবসময় আলাদা বৈশিষ্ট্যে রাখার চেষ্টা করে সবাই। জঙ্গলের ভেতরে হাঁটা পথ তৈরি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাছাড়া লোকালয় থেকে এসব জঙ্গল আলাদাই রাখতে হয়। সংলগ্ন নদী খালে থাকে হেঁটে পাড় হওয়ার মতো নান্দনিক সেতু। তাতে করে জীববৈচিত্র্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।

তালতলী উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ আলী বলেন, সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ থেকে লেআউট, ডিজাইন তৈরি এমনকি অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন বন বিভাগের লোকজন। এখন যদি তারা বলেন যে, কিছুই জানেন না তবে সেটি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। জেলা বন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এলজিইডি আমাদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা কিংবা সমন্বয় করেনি। এরকম কোনো দাবি যদি তারা করে থাকে তা সত্য নয়। জঙ্গলের ভেতরে কোনো অ্যাপ্রোচ সড়ক আমরা করতে দেব না। তালতলীর উপজেলা চেয়ারম্যান রেজভি উল কবির বলেন, ‘আমরা সেতু’র বিপক্ষে নই। তবে সংরক্ষিত বনের বৈশিষ্ট্যও ঠিক রাখতে হবে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]