বরিশালে করোনা চিকিৎসায় পাশে নেই বেসরকারি সেবাকেন্দ্রগুলো

Barisal Crime Trace -HR
প্রকাশিত এপ্রিল ১০ শনিবার, ২০২১, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ
বরিশালে করোনা চিকিৎসায় পাশে নেই বেসরকারি সেবাকেন্দ্রগুলো

বরিশালক্রাইমট্রেস ডেস্কঃ কেবল নেই আর নেই। তারপরও করোনা রোগীদের চিকিৎসায় একাই সব করছে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবামেক) হাসপাতাল। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এ চাপ আর কতদিন সামলাতে পারবে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

এখানে থাকা ১৫০ শয্যার মধ্যে খালি আছে মাত্র ২৩টি। প্রতিদিন যে হারে রোগী বাড়ছে তাতে বড়জোর ৩-৪ দিন নতুন রোগী ভর্তি করা যাবে। এরপর বন্ধ হয়ে যাবে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় থাকা একমাত্র এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দুয়ার।

তারপর কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সবাই। এদিকে বরিশালে থাকা ১১০টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কোথাও দেওয়া হচ্ছে না করোনার চিকিৎসা।

করোনা সংক্রমণের এক বছর পরও বরিশালের স্বাস্থ্য সেক্টরে যে কোনো উন্নতি হয়নি, তা চেখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। পুরো বিভাগে একমাত্র ডেডিকেটেড কেন্দ্র হিসাবে থাকা বরিশাল শেবামেক হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের অবস্থা বেহাল।

করোনা ঠেকাতে গত বছর এখানে ডেপুটেশনে দেওয়া ৪০ চিকিৎসকের সবাই এরইমধ্যে লবিং-তদবির করে চলে গেছেন পুরোনো কর্মস্থলে। একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া ৩০ পরিচ্ছন্নতা কর্মীকেও নেওয়া হয়েছে উঠিয়ে।

করোনা ওয়ার্ডের ৫তলা ভবনে ৪টি লিফট বসানো হলেও তা কবে চালু হবে জানে না কেউ। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে হয় নিচতলা থেকে ৫তলায়।

গুরুতর করোনা রোগীদের বেঁচে থাকার একমাত্র অনুষঙ্গ অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোও সিঁড়ি দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে ওঠাতে হয় ৫তলা পর্যন্ত। ১৫০ শয্যার প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও এই করোনা ওয়ার্ডের জন্য নেই আলাদা কোনো চিকিৎসক কিংবা নার্স।

শেবামেক হাসপাতালের দেওয়া জনবলে চলে এটি। সেখানেও আছে জটিলতা। কাগজে-কলমে এক হাজার বেডের হলেও শেবামেক চলে ৫০০ বেডের জনবলে। তাও আবার রয়েছে চিকিৎসক সংকট। নির্ধারিত জনবলের তুলনায় ৯৭ জন ডাক্তার কম রয়েছে এখানে।

ইনডোর ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ডা. সুদীপ হালদার বলেন, ‘করোনা ওয়ার্ডের ১৫০ বেডসহ এই হাসপাতালে প্রতিদিন থাকে দেড় হাজারের বেশি রোগী। অথচ জনবল ৫০০ বেডের।

তাও আবার শূন্য রয়েছে ১০০ চিকিৎসকের পদ। করোনা রোগীদের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে জরুরি যে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, তা রয়েছে মাত্র ১২টি। ৩ শিফটে ৩০ জন চিকিৎসক ডিউটি করে করোনা ওয়ার্ডে।

এটা প্রয়োজনের মাত্র ৫৫ শতাংশ। এখন আপনারই বলুন কী করতে পারি আমরা?’ করোনা ওয়ার্ডের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা শেবামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘লিফটগুলো চালু করতে বহুবার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ কানে তুলছে না। ঢাকায় চিঠি দিয়ে ১০০ হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা চাওয়া হয়েছে। আইসিইউ বেড বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছি। চিকিৎসক-কর্মচারী বৃদ্ধি না-হলে খুব বেশিদিন এখানে চিকিৎসা দিতে পারব না আমরা। তা ছাড়া যে হারে রোগী বাড়ছে তাতে স্থান সংকুলানও হবে না। এখনই উদ্যোগ নেওয়া না-হলে নতুন যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের ভাগ্যে কী জুটবে জানি না।’

সরকারি হাসপাতালে যখন ক্রমেই কমে আসছে করোনা রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ, সেখানে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিক নিয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বরিশাল নগরের কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় না করোনা রোগী।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই চলছে এমন পরিস্থিতি। দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এখানকার ব্যক্তিমালিকানাধীন এ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছিল যে, করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ৫০টি শয্যা প্রস্তুত রেখেছে তারা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো গত এক বছরেও সেখানে ভর্তি করা হয়নি কোনো করোনা রোগী। বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘করোনা রোগীদের চিকিৎসায় যে এত জটিলতা থাকে, তা আমাদের জানা ছিল না। তা ছাড়া এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই আমাদের। যে কারণে করোনা রোগী ভর্তি করছি না আমরা।’

বরিশাল ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট কাজী মফিজুল ইসলাম কামাল বলেন, ‘বরিশাল নগরে থাকা ১১০টি বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকের কোনোটিরই শয্যাসংখ্যা ৫০-এর বেশি নয়। তা ছাড়া এসব হাসপাতালে নেই আইসিইউ, ভেন্টিলেটর কিংবা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। অথচ এর সব কটিই করোনা চিকিৎসায় অত্যন্ত জরুরি। এই অবস্থায় করোনা রোগী ভর্তি করা হলেও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই করোনা রোগী ভর্তি করছি না।’

বরিশালের লেখক ও গবেষক আনিসুর রহমান স্বপন বলেন, ‘করোনা রোগীদের সর্বাগ্রে যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে অক্সিজেন। এখানে অন্তত দুটি বেসরকারি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই সিস্টেম রয়েছে। প্রশাসন চাইলেই এই দুটি হাসপাতালকে রিকুইজিশন করে করোনা রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সরবরাহ করেও এই হাসপাতাল দুটিকে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব।’

পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বরিশালের জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘করোনা রোগীদের চিকিৎসায় শয্যা সংকটের বিষয়টি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। বরিশালের বাস্তবতায় এখানে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব।

সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাইর সুবিধা থাকা বেসরকারি হাসপাতালগুলো নিয়ে আমরাও ভাবছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া শুরু করলে সেটাই করব আমরা।

তা ছাড়া শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আরও ৫০ বা ১০০টি শয্যা বাড়ানো যায় কি না, সেই চেষ্টাও চলছে। হাসপাতালের যেসব ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা কম, সেরকম একটি বা দুটি ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা করে সেগুলোকে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। আশা করি, এটা হয়ে গেলে বরিশালে করোনা চিকিৎসায় আর কোনো সংকট থাকবে না।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]