জামিনে বেরোনো আসামিদের ‘টার্গেট’ করে চলছে জঙ্গি সংগঠনের প্রচারণা


ebdn প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৪, ২০২২, ১২:৫৪ অপরাহ্ণ /
জামিনে বেরোনো আসামিদের ‘টার্গেট’ করে চলছে জঙ্গি সংগঠনের প্রচারণা

অনলাইন প্রতিবেদক : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তা একমত নন। হাজিরা না দেওয়ার পেছনে জঙ্গিদের আর্থিক অসচ্ছলতাকেও কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা।

 

 

জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটছে অনেক। গত ২১ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলী থেকে হাফিজুর রহমান ওরফে সকাল নামে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) এক সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট।

 

 

হাফিজুর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতেন। পরে তা কারাগারে বন্দি জেএমবি সদস্যদের মুক্তির জন্য ও সংগঠনের কার্যক্রম বেগবান করতে ব্যয় করতেন। হাফিজুরের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মামলা রয়েছে।

 

 

 যারা জামিনে বেরিয়ে আসছেন তাদের টার্গেট করেও জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। জামিনে বেরিয়ে এসে যারা হাজিরা দিচ্ছেন না, তাদের অনেকেই সংগঠনের সঙ্গে আবারও সম্পৃক্ত হচ্ছেন।

 

এর আগে গত ৩০ জুন জেএমবির পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি মো. মেহেদী ওরফে মেহেদী হাসানকে (৩০) গ্রেফতার করে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। মেহেদী ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট রাত ১টার দিকে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা এলাকায় জেএমবির কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে নাশকতামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে গোপন বৈঠক করছিলেন। খবর পেয়ে স্থানীয় গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযান চালালে মেহেদী কৌশলে পালিয়ে যান। দীর্ঘ পাঁচবছর ধরে যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

 

 

অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তবে শঙ্কা এখনো আনসার আল ইসলামকে নিয়ে। আন্তর্জাতিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার অনুসারী আনসার আল ইসলামকে ভারতীয় উপমহাদেশের আল-কায়েদার শাখা একিউআইএস (আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট) হিসেবেও ধরা হয়। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ পর‌্যায়ের জঙ্গিরা জামিনে বের হলে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বা পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যদের জানিয়ে জানায়। এরপর জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যের ওপর নজরদারি করা হয়।

 

 

 

জঙ্গিদের জামিন প্রসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে অনুরোধ জানানো হয়, সাধারণ চোর-ডাকাতদের মতো জঙ্গিদের যেন জামিন দেওয়া না হয়। জঙ্গিদের জামিন দিলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ, চোর-ডাকাতদের মোটিভেশন আর জঙ্গিদের মোটিভেশন অনেক পার্থক্য রয়েছে।

 

২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলা হয়। এ সময় জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রমে বেশ সক্রিয় ছিল। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ দু-তিন বছরেই তাদের কার্যক্রম নস্যাৎ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েক বছর ধরে জঙ্গিদের কোনো অপারেশনাল কার্যক্রম নেই। এর মানে এই নয় যে, তারা থেমে আছে। তারা গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আগে একটি জঙ্গি সংগঠনের দুজন বোমা তৈরির কাজ জানলে তাদের ধরা হলে সেই সংগঠনটি দুর্বল হয়ে যেত। তবে সেই সংগঠনের যদি ২০০ সদস্য বোমা তৈরিতে পারদর্শী হয় তাহলে কতজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে?

 

 

 

জঙ্গিদের আকার-ইঙ্গিত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জঙ্গিরা তাদের সদস্যদের বলছে- প্রস্তুতি নিতে, দাওয়াত দিতে এবং গ্রাউন্ড তৈরি করতে। যাতে ঝড় এলে তা ঠেকানো যায়।

 

 

সিটিটিসির একটি সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গিরা অর্থ সংগ্রহের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি সংগঠনের নেতাসহ বিভিন্ন পর‌্যায়ের সদস্যরা কারাগারে থাকার ফলে এবং জামিন নিতে ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে জঙ্গিরা অর্থ সংকটে পড়ছে। এজন্য তারা অর্থ সংগ্রহের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে। এছাড়া জঙ্গিরা তাদের সদস্য বাড়াতে দাওয়াতি কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হলে তাদের কার্যক্রম চালাতে সহজ হবে। যেসব জঙ্গি কারাগারে আছে তাদের জামিনে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

 

অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে যেভাবে
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সারাদেশ থেকে বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত ও ধর্মান্ধ মুসলমানদের টার্গেট করে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন জঙ্গিরা। দু-তিন হাত ঘুরে সেই টাকা চলে যাচ্ছে জঙ্গি সংগঠনে। এসব জঙ্গি সংগঠনের অর্থ সংগ্রহকারীদের মাসিকভিত্তিতে বেতন দেওয়া হয়। অর্থ সংগ্রহকারীরা মাস শেষে বেতন হিসেবে বেশ বড় অঙ্কের টাকা পান। এসব সদস্য সংগঠনের বেতনভুক্ত কর্মচারী। যাদের অন্য কোনো পেশা নেই। তারা শুধু জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

 

জামিনে বেরিয়ে জঙ্গিদের বড় পরিকল্পনা
বিভিন্ন সূত্রে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, ভবিষ্যতে জঙ্গিদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। গোপনে সে অনুযায়ী তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যে পরিকল্পনা এক থেকে দুই বছরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণে দীর্ঘ মেয়াদে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় নিজেদের সদস্যদের কাছেও তা প্রকাশ করছে না জঙ্গি সংগঠনগুলো। বর্তমানে দাওয়াত, সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও গ্রাউন্ড তৈরির ওপর বেশি জোর দিচ্ছে তারা।

 

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জামিনে বেরিয়ে জঙ্গিরা বড় কোনো পরিকল্পনা করছে- এমন তথ্য আপাতত নেই। তবে যারা এই পথের লোক তারা থেমে থাকবে না। এ বিষয়ে এটিইউ সচেতন আছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চলমান। এছাড়া যেসব জঙ্গি জামিনে বেরিয়ে এসেছে তাদের আমরা মোটিভেশন করছি। তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখছি। এরই মধ্যে এটিইউয়ের পক্ষ থেকে ‘ইসলামের দৃষ্টিতে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ’ শীর্ষক বই প্রকাশ হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষও অনেক সচেতন। দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভালো হলে ধীরে ধীরে জঙ্গিবাদ কমে আসবে।

 

র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান বলেন, কোন পর‌্যায়ের জঙ্গিরা জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে থাকছেন তা দেখার বিষয়। আসলে পালিয়ে থাকছেন ঠিক নয়, বিষয়টি হচ্ছে হয়তো তারা হাজিরা দিচ্ছেন না। হাজিরা না দেওয়ার কারণ তাদের আর্থিক বিষয়ও হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার ফলে অনেক জঙ্গির আর্থিক সামর্থ্য নাও থাকতে পারে। কিংবা আদালতে তার আইনজীবী ধরার বিষয় রয়েছে, তাদের ফি রয়েছে। এসব কারণে হয়তো অনেকেই নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না।

 

তিনি বলেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত মনিটরিং করে র‌্যাব। একই সঙ্গে তাদের ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশনের (উগ্রপন্থা থেকে সরে আসার) কাজ চলমান। জামিনে বের হয়ে এসে যাতে নতুন করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে না পারে বা সংগঠিত হতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, র‌্যাবই প্রথম জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে।

 

এটিইউ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. কামরুল আহসানে বলেন, যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে দেশ অনেক বেশি নিরাপদ। জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। যেসব জঙ্গি জামিন নিয়েছেন তাদের মনিটরিং করা হয়। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে এটিইউ গ্রেফতার করেছে, যারা পলাতক ছিলেন। যদি কোনো জঙ্গি পলাতক থাকেন তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যুর পর গ্রেফতার করা হবে।

 

 

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি জঙ্গিদের ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া ও সিক্রেট গ্রুপ মনিটরিংসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নজরদারির মাধ্যমে জানা যায়, বর্তমানে তারা নিজেদের সদস্যদের বিভিন্ন আক্রমণের কলাকৌশল, বোমা তৈরির কৌশল ও ড্রোন হামলার কৌশল সম্পর্কে বেশি প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।

 

তিনি বলেন, যারা জামিনে বেরিয়ে আসছেন তাদের টার্গেট করেও জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। জামিনে বেরিয়ে এসে যারা হাজিরা দিচ্ছেন না, তাদের অনেকেই সংগঠনের সঙ্গে আবারও সম্পৃক্ত হচ্ছেন।

 

জামিনে বেরিয়ে আসা জঙ্গিদের প্রচার-প্রচারণা বেশি প্রভাবিত করবে বলে মনে করেন সিটিটিসি প্রধান।

 

অতিরিক্ত আইজিপি মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সিটিটিসির ধারাবাহিক অভিযান ও তৎপরতায় জঙ্গিরা কোণঠাসা। কিন্তু ‘লোন উলফ’ (একাকী নিজে থেকে পরিকল্পনা করে হামলা করা) হামলার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।