একজন মানুষকে কতবার ক্ষমা করা যায়?


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২, ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ /
একজন মানুষকে কতবার ক্ষমা করা যায়?

ডেস্ক সংবাদ : পারিজাত রহমান পাঁচ মিনিট সময় নিলেন নিজের জন্য। তারপর শামারুখ ইসলামকে ডাকলেন। শামাকে বললেন বাচ্চাকে নিয়েই ভেতরে আসতে। রিসিপশনের মেয়েটিকে বললেন কিছু বাচ্চাদের খেলনা ভেতরে দিয়ে যেতে।

 

বসুন, কেমন আছেন?

কিছু কি হয়েছে। বাচ্চাটাকে খেলনা দিয়ে বসিয়ে রাখতে রাখতেই বললো শামা, ফাহিম আমাকে গাড়ির চাবি দিয়ে চলে গেলো। বললো ট্রেনে করে অফিস যাবে কাজ আছে। আমি যেন সেশন শেষে বাসায় চলে যাই। কিন্তু শুরুতে বলেছিল আজ ছুটি নিয়েছে।

 

নাহ কিছু হয়নি তো, বললেন জরুরি মিটিং আছে তার অফিসে যেটা তিনি আগে ভুলে গিয়েছিলেন।

 

ওহ, কেমন মনে হলো কথা বলে? কি বুঝলেন?

 

পারিজাত রহমান দীর্ঘশ্বাস গোপন করে জিজ্ঞাসা করলেন কেমন গেছে আপনার সপ্তাহ?

আমি আর কি বলবো, কোনটা রেখে কোনটা বলবো। চল্লিশ মিনিটের সেশনে কতটুকুই বা বলা যায়। আমি আমার এক বান্ধবী এখানেই থাকে আর আমার বোনের সঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করেছিলাম। কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে। নয়তো বাঁচবো কিভাবে। দম বন্ধ লাগে সারাক্ষণ।

 

আমার সেসব ম্যাসেজের স্ক্রিনশট ফাহিম একফাঁকে আমার মোবাইল থেকে নিয়ে তার ফোনে পাঠিয়েছে। এরপর কালার প্রিন্ট করে আমাকে হুমকি দিচ্ছে। আমি তার আর তার পরিবারের সম্মানহানি করছি। তার পরিবারের কথা আমার বোন আর বান্ধবীকে বলে তাকে ছোট করছি। সে এগুলো আমার বাবা-মাকে দেখিয়ে আমার বিচার করবে। সে দেশে গিয়ে আমার নামে বিচার দেবে। আমার একটা বিহিত করতে হবে!

 

আপনার কি মনে হয় না সে ভয়ানক অসুস্থ?

সে যা খুশী তাই করে বেড়ায়। সব কিছুই নীতিহীন। আর সেগুলো ঢাকতে আমার পেছনে এভাবেই লেগে থাকে। তার এক চিকিৎসক বন্ধু তাকে নুড ভিডিও পাঠিয়েছে। হাসপাতালের নার্সদের নিয়ে অশ্লীল রসিকতা করে টেক্সট করেছে। আমার মেয়ে ছুটির দিনে তার বাবার মোবাইল নিয়ে গেমস খেলতে গিয়ে দেখে ফেলছে।

 

আমি এটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করার পর তার তো কোনো অনুতাপ নেই। উল্টা বলে ছেলেরা এমন কথা বলেই। সে হাসপাতালে নাইট ডিউটি করতে গিয়ে বোর হয়ে গেছে তাই রিচার্জ হওয়ার জন্য মজা করেছে। আমি যেন এসব নিয়ে মাথা না ঘামাই, আমার তার ফ্রেন্ডস নিয়ে কথা বলার দরকার নেই!

 

নামাজ কালাম পড়তে বললে তাও পড়বে না, বলে তুমি তো পড়, তাহলেই হবে!

তাই হয় কখনো?

সব প্রেগন্যান্সিতেই থাকার গেস্ট নিয়ে আসে, একমাস, দুইমাস। তিনমাস ধরে থাকে। এবার এসেছিল তার চাচাতো ভাই। আমি পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট, তিন মাস ছিল। প্রায় আমার কাছাকাছি বয়স, বিবাহিত। অনেকবার বলেছি বউ নিয়ে আসতে। আনেনি, চাকরি পেলে আনবে। ফাহিম সকালে অফিসে যায়। সারাদিন বাসায় তার চাচাতো ভাই টিভি দেখেও। ল্যাপটপে গেম খেলে। উল্টোপালটা কথা বলে।

 

আমি একদিন ফাহিমকে বললাম, জোয়ান এক ছেলে সারাদিন বাসায় থাকে। আমার শরীরটা ভালো না। গরমের দিন, নিজের মতো করে থাকতে পারি না। তুমি তোমার ভাইকে সকালে নিয়ে বের হও। আবার যেন তোমার সঙ্গে বাসায় আসে। বাইরে ঘুরুক। ঘরে বসে গেম খেললে কে চাকরি দেবে?

 

আমাকে কি বললো জানেন?

তোমার কি আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিছানায় যেতে মন চায়? তা না হলে এগুলো বলো কেন? সে তার মতো গেম খেলে, খায়, ঘুমায়, তোমার সমস্যা কি?

 

আপনি বলেন, এটা কোনো স্বামীর কথা হতে পারে? আমি তার বিয়ে করা বউ, আবার প্রেগনেন্ট, তার কি আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? এত নোংরা কথা যেই লোক বলতে পারে, তার সঙ্গে কি থাকতে ইচ্ছে করে?

 

সে বিয়ের মোহরানা দেয়নি এখনো। কোনো হাত খরচ দেয় না। টাকা জমতে দেয় না। বউ হিসেবে কোনো সম্মান, নিরাপত্তা কিছুই দেয় না। সেসব সিদ্ধান্ত নেয় তার ছোটবোনের সঙ্গে।

 

এখন উল্টা আমার মোবাইলের স্ক্রিনশট নিয়ে আমাকেই হুমকি দিচ্ছে! সে আমার স্বামী তার মানে তো এই না যে সে আমার ব্যক্তিসত্তা কিনে নিয়েছে।

 

আমি আমার নিজের বোনকেও কিছু বলতে পারবো না? বাবা-মাকে তো কিছু বলতে পারি না লজ্জায়। একটার পর একটা ভয়াবহ অন্যায় করে যাচ্ছে, আমি সংসার বাঁচাতে যতই চুপ থাকি সে ততই পেয়ে বসে।

 

সে তো তার ভাই-বোনদের সঙ্গে কত ম্যাসেজ পাঠায়, ফোন করে। প্ল্যান প্রোগ্রাম করে। আমি তো কোনোদিন দেখতেও যাই না। একটা মানুষকে তো শ্বাস নেওয়ার জায়গা দিতে হবে। সে ভয়াবহ হীনমন্নতায় ভোগে সারাক্ষণ। নিজের সমস্যা ঢাকতে আমার সঙ্গে এমন করে সব সময়ে।

 

আমি বুঝি না, এই ধরনের মেরুদন্ডহীন কাপুরুষ ছেলেরা বিয়ে করে কেন? একটা পরিবার ও সেই পরিবারের মেয়ের জীবন নষ্ট করে এরা কি শান্তি পায়?

 

পারিজাত রহমান এতক্ষণ শুনছিলেন, বললেন উনি যথেষ্ট চালাক একজন মানুষ। খুব সম্ভবত আমার কাছে আর আসবেন না। তবে আসলে ভালো হতো।

 

তার ছোটবেলা কোনো কারণে ভালো যায়নি। বিশেষ করে দুই থেকে চার বছর। যেই সময় মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন হয় এবং উনি যে রোগে ভুগছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার নাম ‘নার্সিসিস্ট পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’। এটা ছেলেদের বেশি হয়। উনি নিজেকে ছাড়া দুনিয়ার আর কিছু চিন্তা করতে পারেন না।

 

Narcissistic personality disorder (NPD). A disorder in which a person has an inflated sense of self-importance. Narcissistic personality disorder is found more commonly in men. The cause is unknown but likely involves a combination of genetic and environmental factors.

 

দুঃখজনক হলেও সত্যি এই রোগ পুরোপুরি কখনোই ভালো হয় না। এরা নিজে যা চিন্তা করেন সেটাই একদম ঠিক বলে মনে করেন। এর বাইরে আর কিছু থাকতে পারে না। এরা নিজেরাও যথেষ্ট কৌঁসুলি, ক্ষেত্রবিশেষে বুদ্ধিমান। খুবই ভালো মেন্টাল গেম খেলতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই মনের মাঝে হিংস্রতা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। খুব সম্ভবত তার বাসাতেও এমন কেউ আছেন যার প্রভাবও তার মাঝে বেশ।

 

তবে উনার চেয়ে যারা দুর্বল তাদের কাছে উনি ভালো। বেশ ভালো এবং অমায়িক। একমাত্র উনার চেয়ে যারা সবল তাদের সঙ্গেই উনি গেম খেলেন। সবলদের মানসিক কষ্ট দিয়ে উনি ভেতরে ভেতরে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান। এই আনন্দ উনি আর কিছুতেই পান না।

 

উনি এটাকে হারজিতের খেলা মনে করেন। আপনার ক্ষেত্রে ওই বোধটাই তার নেই যে এটা তার জীবনসঙ্গী। এখানে গেম খেললে বুমেরাং হয়ে যাবে।

 

দুঃখজনক হলেও সত্য, আপনি সবল এবং বুদ্ধিমতি আর উনার সবচেয়ে কাছে থাকেন। তাই মানসিক অত্যাচার আপনাকেই বেশি নিতে হচ্ছে। আপনি যে তার ব্যবহারে ভয়াবহ কষ্ট পাচ্ছেন এগুলো উনি কিছু ফিল করেন না। উনি নিজেকে নিয়ে নিজের জগতে বিভোর থাকেন। সারাক্ষণ হারজিতের খেলার ছক কাটেন। আপনার দুঃখ কষ্ট তাকে স্পর্শ করে না এমনকি বাচ্চাদের কষ্টও তাকে নাড়া দেয় না। মাথার ভেতরে একটা মাইন্ড সেট করা। তার বাইরে আসতে পারবেন না। এটা তার সীমাবদ্ধতা।

 

এই রোগ ভালো করার কোনো উপায় নেই?

এটা একটা স্থায়ী মানসিক সমস্যা। একমাত্র উনি নিজে যদি বোঝেন বা স্বীকার করেন বা মনে প্রাণে বিশ্বা করেন যে তার কিছু সমস্যা আছে যা সমাধান হওয়া দরকার। পরিবারের সদস্যদের সহমর্মিতা ও সাহায্য পায় তাহলে কিছুটা স্বাভাবিক বা ভালো থাকবেন। কিন্তু পুরোপুরি চলে যাবে না।

 

শামার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে টেবিলের ওপরে থাকা টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুখ মুছছে। কিন্তু পানি আর থামে না। ছোট ছেলেটা অবাক হয়ে তার মাকে দেখছে।

 

আমি বাকি চারটা সেশনেও আসব। আপনি আমাকে একটু বলবেন আমি এখন কি করব?

দেখুন, আমি একজন মনোচিকিৎসক। আমার কাজ কথা বলে সমস্যা খুঁজে বের করা। সমাধান থাকলে সমাধানের উপায় বলে দেওয়া। কিন্তু সিদ্ধান্ত দেওয়া না। আপনি একজন অ্যাডাল্ট মানুষ। আপনার সিদ্ধান্ত আপনার নিতে হবে। আপনি তার সঙ্গে থাকতে চান নাকি চান না এটা সম্পূর্ণ আপনার সিদ্ধান্ত। এরপর আমি হয়তো আপনাকে কিছু উপদেশ দিতে পারি অস্ট্রেলিয়ান আইন অনুযায়ী আপনার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে।

 

শামা চুপ করে আছে। দু’চোখ জানালার বাইরে চলে গেলো। নীল ঝকঝকে আকাশ। ঝলমলে রোদ, শুধু তার ভেতরটা পুড়ে পুড়ে ধূসর ছাই।

 

আচ্ছা একজন মানুষকে কতবার ক্ষমা করা যায়? আমি তো ফেরেশতা নয়। আপনাকে তো আমি তার পুরো কাহিনি বলিনি। আরো যে কতকিছু করেছে, আমি কোনোদিন তার বাবা মাকে পর্যন্ত বলিনি তবুও সে দিন দিন বেপোয়ারা।

 

একবার আমার শ্বশুরকে বলে দেবো বলায় বলছে তার বাবা অসুস্থ। তার বাবার যদি কিছু হয় তাহলে আমাকে মেরে ফেলবে।

 

আর একবার হাতে চাকু নিয়ে পুরোবাড়ি পাঁয়চারি। আমি নাকি আমার বাবা-মা ভাই-বোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবো না। তারা ভালো না। তিনটা চাকু হাতে নিয়ে হাঁটছে আর মুখে বলছে মেরে ফেলবো। সবগুলোকে মেরে ফেলবো। আমি ভয়ে বাচ্চাদের নিয়ে একটা রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছি। তখন বলে তোমাকে মারবো না। ঢাকা গিয়ে তোমার মা-বাবা ভাইকে মেরে আসবো।

 

আমি কিন্তু তবুও পুলিশে কল করিনি। অথচ এবার তার বোন মিথ্যা বলে ধরা পড়েছে। বোনকে বাঁচাতে গিয়ে বাসায় ল্যাপটপ ভেঙেছে। টিভি রিমোট আঁছাড় দিয়েছে। বই ছুড়ে মেরেছে, বাজার ছুড়ে ফেলেছে। চিৎকার করেছে, আমার মেয়ে বড় হচ্ছে। ভয় পেয়ে পুলিশ কল করছে। এটাও এখন আমার দোষ, আমি নাকি তাকে ফাঁসাতে মেয়েকে দিয়ে এগুলো করিয়েছি।

 

এটা তো বাংলাদেশ না, অস্ট্রেলিয়া। এখানে আমি তার সঙ্গে না থাকতে চাইলে সে কি একদিনও আমাকে রাখতে পারবে? তাকে আমার ফাঁসিয়ে কি লাভ? আমি তো বরং চেষ্টা করছি তাকে সুস্থ করে তুলতে।

 

আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি, ফাহিমের মতো মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। আমি আরও ক্লায়েন্ট পেয়েছি এমন। এখন আপনি বলেন আপনি কি করতে চান?

 

আলাদা হতে চাইলে অস্ট্রেলিয়া সরকার আপনাকে সবরকম সহযোগিতা করবে, যতদিন আপনি চাকরি না পান। আপনার বাচ্চাদের সব সুযোগ-সুবিধাও দেবে, আপনি কি অস্ট্রেলিয়ান সিটিজেন?

 

শামা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, বললো জ্বী, ভেঙে তো ফেলাই যায় যখন-তখন। এই অপশন তো আছেই। তবে আমি তাকে আর একবার সুযোগ দিতে চাই। শেষ সুযোগ। দেখি ভালো হয় কিনা। না হলে শেষ বিদায় দেব। হাজারবার বলেও তখন আর ফিরব না। আমি যা বলি তা করি।

 

বিয়ে করেছিলাম সংসার করার জন্যই। কিন্তু সংসার, সম্মান, ভালোবাসা, বিশ্বাস কোনোটাই পাইনি। শুধু আমার জীবনের ১২ বছর শেষ, আর অসহায় দুটো বাচ্চার দায়িত্ব আমার একার। বাচ্চার মা হিসেবেও মূল্যায়ন করে না। সারাক্ষণ বলে আমি নাকি কোনো মা না, বাচ্চারা নাকি হাওয়া বাতাসে বড় হচ্ছে।

ঠিক আছে, এক্ষেত্রে আপনাকে আমি কিছু সাজেশন দেই, তার সঙ্গে যথাসম্ভব কম কথা বলবেন। তার ফামিলি, বন্ধু নিয়ে একদম কিছু না। আপনি নিজেকে সময় দেন।

 

এভাবেই তো চলছি গেলো ৫ বছর। তবুও খুবই ছোটোখাটো জিনিস, যেমন এক রকম মোজা খুঁজে পাই না কেন? এখনো বাচ্চারা জেগে আছে কেন ইত্যাদি নিয়ে ঝগড়া শুরু করে আলাদা রুমে ঘুমায় মাসের পর মাস। কাছে গেলেও উঠে বাইরে চলে যায়।

 

জ্বী, যদিও কনফার্ম না হয়ে বলা ঠিক না। তবে তার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তিনি হয়তো কিছু শারীরিক সমস্যার মধ্যে দিয়েও যাচ্ছেন। যার অবশ্যই চিকিৎসা আছে এক্ষেত্রে তার উচিত ছিল আপনাকে সেটা খুলে বলা। আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা কিন্তু তিনি যেহেতু স্বাভাবিক না, নার্সিসিস্ট সেজন্য তিনি এখানেও ভুল পথে হেঁটেছেন, কিন্তু তিনি ভাবছেন তিনিই ঠিক।

 

শামার দু’চোখ বেয়ে আবারো জলের নদী

 

আপনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। অনলাইন কোনো কোর্সে ভর্তি হন। বাচ্চাদের সময় দেওয়ার পাশাপাশি আপনারা কোনো শখ আছে? ছোটবেলার।

 

ভারি গলায় শামা বললো, গান গাইতাম চার বছর গান শিখেছি। গাছ পছন্দ করি। অনেক গাছ ছিলো ঢাকার বাসায়।

 

জ্বী, ওগুলো আবার শুরু করুন। আবারো গান প্র্যাকটিস করেন। গাছ লাগান। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে কোনো ঝগড়া ঝাটিতে যাবেন না। তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সামনে থেকে সরে যাবেন। ধীরস্থির উত্তর দেবেন। তুমি আমাকে কোনো সময় দাও না, আমি নিজের মানসিক শান্তির জন্য এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমি একটা আলাদা মানুষ। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি তোমার কোনো শখে ঝামেলা করি না।

 

জ্বী, আমি শুরু করবো, আমি আবার আসবো আপনার কাছে, অনেক ধন্যবাদ।

অবশ্যই আসবেন,

ফাহিম আসতে চাইলে আসবেন। তবে আপনি ওনাকে এখানে আসার ব্যাপারে কিছু বলবেন না। আপনি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বা করেন?

 

জ্বী অবশ্যই বিশ্বাস করি। ওই বিশ্বাসের ওপরেই এখনো টিকে আছি।

 

তাহলে মনে রাখবেন, সৃষ্টিকর্তা সবারই পরীক্ষা নেন বিভিন্নভাবে তবে কোনো মানুষকেই তিনি তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা দেন না। আপনি পারবেন বলেই আপনাকে এই পরীক্ষায় ফেলছেন।

 

শামা তাকিয়ে থাকলো, তারপরে হাতের টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে হালকা হাসি দিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বের হয়ে গেলো।

 

পারিজাত রহমান উঠে দাঁড়ালেন। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে শামার চলে যাওয়া দেখলেন। এরপরে ধীর পায়ে চেম্বারে ঢুকে গেলেন।

 

এক সপ্তাহ দেখতে দেখতে চলে গেলো, আবার এক মঙ্গলবার, পারিজাত রহমান মনে মনে ভাবছেন। আজ শামা আসবে।

 

কিন্তু না আসে না। দুই সপ্তাহ যায়। তিন সপ্তাহ যায়। শামা আর আসে না। রিসেপশনের মেয়ে ম্যাসেজ করেছিল তৃতীয় সেশনের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য। শামা উত্তর দিয়েছে সে একটু অসুস্থ, সুস্থ হয়ে আসবে।

 

পারিজাত রহমান মনে মনে দিন গোনেন, মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। একদিন শামা আসবে। অথবা দেখা হয়ে যাবে কোনো জনবহুল জায়গায় বা সবুজ প্রান্তরে যেখানে সে হাসতে হাসতে এসে বলবে, ভালোই হলো দেখা হয়ে গেলো। আপনাকে আমি কত খুঁজেছি।

 

দেখেন আমি এখন স্বনির্ভর এবং অনেকে ভালো আছি, বেঁচে আছি, যখন খুশী হাসতে পারি, গাইতে পারি, উড়তে পারি।

 

পারিজাত রহমান খুব করে চান এমন একটা দিন আসুক, শামার মতো শক্তিশালী মেয়েরা মাথা উঁচু করে বাঁচুক, যেন অন্য শামারা অনুপ্রেরণা পায়, স্বপ্ন দেখতে শেখে।