অসমাপ্তই থাকলো হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২, ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ /
অসমাপ্তই থাকলো হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : নেওয়া হয় উন্নয়ন প্রকল্প। বেঁধে দেওয়া হয় খরচ, বেঁধে দেওয়া হয় সময়। তবে প্রায় প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। ফলে খরচ বাড়ে, প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় জনগণ। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ার অন্যতম কারণ বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বারবার বলা হলেও থামছে না প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের ঘটনা। একটি প্রকল্পে এক, দুই, তিন করে ১৩ জন পরিচালক পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করতে হয়েছে প্রকল্পের কাজ।

 

এমন ঘটনা ঘটেছে, ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পে’।

 

 পিডি প্রকল্পের জন্য খুবই অপরিহার্য। কিন্তু তাদের আমরা ম্যানেজ করতে পারছি না। প্রকল্প হয়তো সিলেটে অথচ পরিচালক বাস করেন ঢাকায়। আমরা এ বিষয়ে কঠোর হচ্ছি। আমাদের সরকারপ্রধান থেকেও বারবার বলা হচ্ছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা যাবে না। তারপরও কিন্তু এটা হচ্ছে

 

এ নিয়ে প্রকল্প তদারকি প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হওয়ার কারণে প্রকল্প কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়াদ এবং অর্থ বৃদ্ধি করে বারবার প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে।

 

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলছেন, মূলত বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেই প্রকল্পের কাজে ধীরগতি দেখা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু কিছু বিষয়ে দুঃখ পাই। তার মধ্যে পিডি (প্রকল্প পরিচালক) একটা বিষয়।

 

 

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্পের জন্য পূর্ণকালীন কোনো পরিচালক নিয়োগ করা হয়নি। মোট ১৩ জন প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বারবার পরিচালক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্প কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়াদ এবং অর্থ বৃদ্ধি করে বারবার প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে।

 

 

 জনগণের টাকায় জনগণের কল্যাণে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। কিন্তু নানা কারণে প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয় জনগণ। মূলত বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেই প্রকল্পের কাজে ধীরগতি দেখা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু কিছু বিষয়ে দুঃখ পাই। তার মধ্যে পিডি (প্রকল্প পরিচালক) একটা বিষয়  ভবিষ্যতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) প্রকল্পসমূহে পরিচালক বারবার পরিবর্তন না করার জন্য মন্ত্রণালয় সচেষ্ট থাকা উচিত বলে মনে করে আইএমইডি।

 

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পের প্রথম পরিচালক ছিলেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রব মিয়া। তিনি ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ইসমাইল হোসেন ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় পরিচালক মাত্র ১৪ দিন দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

এরপর পর্যায়ক্রমে বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ফেরদৌস, মোস্তাক আহমেদ, আবুল কালাম আজাদ, মো. নজির আহমেদ পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালন করেন বাপাউবো’র প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল বাতেন, ওবায়দুর রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন ও কে এম আনোয়ার হোসেইন। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নাজির আহমেদ, মো. আব্দুল হাই ও জুলফিকার আলী হাওলাদার। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মো. নিজামুল হক ভুইয়া। অর্থাৎ ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মোট ১৩ জন প্রকল্প পরিচালক।

 

বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, জনগণের টাকায় জনগণের কল্যাণে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। কিন্তু নানান কারণে প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয় জনগণ। মূলত বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেই প্রকল্পের কাজে ধীরগতি দেখা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু কিছু বিষয়ে দুঃখ পাই। তার মধ্যে পিডি (প্রকল্প পরিচালক) একটা বিষয়।

 

বন্যাদুর্গত অসহায় মানুষ ভাসছে নৌকায়, ফাইল ছবি

 

মন্ত্রী বলেন, পিডি প্রকল্পের জন্য খুবই অপরিহার্য। কিন্তু তাদের আমরা ম্যানেজ করতে পারছি না। প্রকল্প হয়তো সিলেটে অথচ পরিচালক বাস করেন ঢাকায়। আমরা এ বিষয়ে কঠোর হচ্ছি। আমাদের সরকার প্রধান থেকেও বারবার বলা হচ্ছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা যাবে না। তারপরও কিন্তু এটা হচ্ছে। আমরা এর একটা সমাধান খুঁজে বের করবো। তবে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।

 

প্রকল্পে অসম ব্যয়

 

 

আবার দ্বিতীয় সংশোধনের পর মোট ৫৮৭ কোটি ২৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মে, ২০১৯ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ৪৪৪ কোটি ৩৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এটি অনুমোদিত ব্যয়ের ৯২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

 

 

 

ফিজিক্যাল মডেল স্টাডি: ফিজিক্যাল মডেল স্টাডির জন্য একমাত্র উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান আরআরআই (রিভার রিচার্স ইনস্টিটিউট), ফরিদপুর। আরআরআই’র ল্যাবরেটরিতে বিশাল হাওর এলাকার ফিজিক্যাল মডেল স্টাডি করার সক্ষমতা নেই। ফলে এ কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফিজিক্যাল মডেল স্টাডি না করেই কাজ করা হয়েছে। ফলে এ খাতে ২ কোটি টাকা অব্যয়িত রয়েছে ।

 

 

বাংলাদেশের ভূ-ভাগের এক-পঞ্চমাংশ হাওর অধ্যুষিত। ভৌগোলিকভাবে ভিন্নধর্মী, অসমতল এবং প্রাকৃতিকভাবে নিম্নভূমি হওয়ায় এ অঞ্চলের জনপদ দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে ছোট-বড় ৪১৪টি হাওর রয়েছে। হাওরগুলো সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত।

 

 

 

এই অঞ্চলসমূহ পাহাড়ের পাদদেশীয় ভূমি হওয়ায় বর্ষার আগাম বন্যা হাওর অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান সংকট। আগাম বন্যায় প্রতি বছর বোরো ফসলসহ অন্যান্য কৃষি ফসল এবং জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। আগাম বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি গ্রহণ করে।

 

 

 

বন্যায় ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে কৃষক, ফাইল ছবি

 

 

জুলাই ২০১১ থেকে জুন ২০১৫ মেয়াদকাল নির্ধারিত করে প্রকল্পটি ২০১১ সালে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তীসময়ে মেয়াদ জুন ২০১৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে প্রকল্পের প্রথম সংশোধন অনুমোদিত হয়। ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় প্রকল্পের নানা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদিত হয়। মেয়াদকাল বৃদ্ধি করা হয় জুন ২০১৯ পর্যন্ত।

 

 

প্রকল্পের মূল বরাদ্দ ছিল ৬৮৪ কোটি ৯৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনের পর বরাদ্দ ছিল ৭০৪ কোটি ৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় সংশোধনের পর বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ৫৮৭ কোটি ২৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

 

 

প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে ৪৪৪ কোটি ৩৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৯২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

 

 

প্রকল্পের মূল কাজ ছিল ডুবন্ত বাঁধ পুনরাকৃতি করা, কম্পার্টমেন্টাল ডাইক নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ, ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণ, কজওয়ে নির্মাণ, ইরিগেশন ইনলেট নির্মাণ, পুরাতন রেগুলেটর পুনর্বাসন, খাল পুনঃখনন এবং সুরমা-বৌলাই রিভার সিস্টেম ড্রেজিং।