চলতি বছর থেকেই ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে : শিবলী


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২, ৮:০৮ অপরাহ্ণ /
চলতি বছর থেকেই ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে : শিবলী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না, কয়েক বছর ধরেই এমন অভিযোগ শুনতে হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি)। তবে চলতি বছর থেকেই ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসা শুরু করবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম।

 

শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজার: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন।

‘দেশের শেয়ারবাজার রুগ্ণ ও জাঙ্ক কোম্পানি দিয়ে চলছে, ভালো কোম্পানি আসছে না’, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিত্রে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা নেসলে, ইনসেপ্টা’র সঙ্গে বসেছি। আমরা নাম বলতে পারছি না, তবে ভালো কোম্পানিগুলো এ বছর থেকেই আসা শুরু করবে।

 

তিনি বলেন, ভালো কোম্পানিগুলো যারা, আমাদের কারণে তাদের একটা সমস্যা আছে। আমরা যখন দেখলাম ইচ্ছেমতো প্রাইসে, বুক বিল্ডিংয়ে মানুষ ঠকে যায়, তখন আমরা একটা ফেয়ার ভ্যালু নির্ধারণ করলাম। ফেয়ার ভ্যালু মেথডে আমরা এখন প্রাইস দেখে-শুনে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এতে কিছু কোম্পানির মনটা ভরছে না।

 

তিনি আরও বলেন, তারা (ভালো কোম্পানি) আমাদের সঙ্গে বসে দেখাচ্ছে, ‘এই ভ্যালুতে আমরা আসবো না।’ এ রকম তিনটা কোম্পানি আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের আমরা চাই, আপনারাও চান। তারা এই ফেয়ার ভ্যালুর একটু ওপরে চায়। আমরা তাদের বলেছি ঠিক আছে, আপনারা আসেন, আমরা হিসাব-নিকাশ করে দেখি কীভাবে আপনাদের হেল্প করতে পারি। আইনগত সহায়তা বা ওয়েভার দিয়ে আমরা সহায়তা করবো।

 

শিবলী বলেন, আর কিছুদিন পরই সব ধরনের বন্ডের লেনদেন শুরু করা হবে। যখন সরকারি বন্ডসহ অন্যান্য বন্ডের লেনদেন শুরু হয়ে যাবে, তখন মার্কেট বর্তমানের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেড়ে যাবে। আর সেটা এ বছরেই সবাই দেখতে পাবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করার সময় সে দেশের অন্যান্য বিষয়ের দিকেও তাকাতে হবে। সেসব দেশের সার্বিক অবস্থা কেমন তাও দেখতে হবে।

 

তিনি বলেন, আমরা বন্ধ ১৮টি কোম্পানি আবার চালু করতে পেরেছি। এসব কোম্পানির যে ব্যাংক ঋণ ছিল তাও পরিশোধের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ঋণ পেলে ব্যাংক ও এনবিআর লাভবান হবে। আর এতে আমাদের এনবিআরের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

 

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কমোডিটি এক্সচেঞ্জে শুধু বাংলাদেশি পণ্য না, বিদেশি পণ্যও কেনাবেচা করা যাবে। আমরা বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। যা খুব শিগগির চালু হবে, এরপর মার্কেটের আকার অনেক বড় হবে।

 

তিনি বলেন, দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বিশ্লেষকরা উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু ওইসব দেশে ঋণ ও সঞ্চয়ের সুদ হার ১ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। জাপানে কেউ ব্যাংকে টাকা রাখলে তার অর্থ কেটে রাখা হয়। ঋণ নিলে সুদ দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ। সেখানে মানুষ ভালো লভ্যাংশ পাওয়ার আসায় শেয়ারবাজারে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে অবস্থা উল্টো। এখানে আমানতের সুদ ৭ শতাংশের কাছে। ঋণের সুদ ৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতিও ৬ শতাংশের কাছে। ফলে মানুষ শেয়ারবাজারে যেতে চায় না।

 

তিনি আরও বলেন, ভারতে ৪০ কোম্পানির শেয়ারের দাম ফেসভ্যালুর নিচে। কিন্তু আপনারা বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখেন, কয়টা কোম্পানি বন্ধ হচ্ছে, কয়টা কোম্পানি মার্কেট থেকে বিদায় নিয়েছে। সমালোচনা করতে হবে ভালোর জন্য, কিন্তু তার আগে বাস্তবতা বুঝতে হবে।

 

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন একভাবে চিন্তা করতাম। আর যখন মাঠে এসেছি, দেখছি, বইয়ে লেখা নিয়মকানুন সব জায়গায় পালন করা যায় না। বাস্তবতার নিরিখে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি অনেককিছুই চাই করতে, কিন্তু সম্ভব নয়। কারণ অনেক কিছুই প্রস্তুত না।

 

অধ্যাপক শিবলী বলেন, সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তি নিয়ে কথা আসছে। অর্থমন্ত্রী চাচ্ছেন, কোম্পানি বাজারে আনতে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর বোর্ড চায় না। পরিচালনায় গতিশীলতা আনতে এসব কোম্পানির বোর্ড ভেঙে দেওয়া উচিত।

 

সিএমজেএফ সভাপতি জিয়াউর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমবিএ সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএমবিএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান।

 

এতে আরও বক্তব্য রাখেন- পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিলের (সিএমএসএফ) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব নজিবুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য জাহিদ হাসান, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ও অধ্যাপক ড. খায়রুল হোসেন, শেয়ারবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল-আমিন, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ডি রোজারিও, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মামুনুর রশীদ, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট বাংলাদেশের (আইসিএবি) কাউন্সিল সদস্য গোপাল চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।

 

এ সময় ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশের শেয়ারবাজার ভালোভাবে কাজ করছে না। কারণ শিল্পায়নে ৯০ শতাংশ পুঁজি ব্যাংক থেকে আসে। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করছে। এরপর ঋণখেলাপি বাড়ছে। সেই ঋণ আবার অবলোপন হচ্ছে। কোম্পানিকে ভালো ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংক বাসায় চলে যায়। ফলে শেয়ারবাজারের বিকাশে ব্যাংকে সুশাসন জরুরি।

 

তিনি বলেন, আরেকটি সমস্যা হলো এখানে ভালো কোম্পানি কম। এই কোম্পানি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে অনেকে প্রণোদনা বাড়ানোর কথা বলছেন। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত ও বহির্ভূত কোম্পানির করের পার্থক্য বাড়ানো অন্যতম। কিন্তু পার্থক্য বাড়ালেও কোম্পানি আসবে না। মূল কথা বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতা কম। এই সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

 

ড. এম খায়ররুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো আচরণ করে। এখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের আরও সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু লাভ হলেই একসঙ্গে সব বিক্রি করে দেওয়া ঠিক নয়।

 

jagonews24

 

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে অনেকগুলো দুর্বলতা আছে। আমাদের জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধন অনেক কম। শিল্পায়নে ব্যাংকের তুলনায় শেয়ারবাজার থেকে কম অর্থায়ন হয়। কাঙ্ক্ষিত বিদেশি বিনিয়োগ নেই। এগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে।

 

তার মতে, একটি দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ১০-১২টি বিষয়ের দরকার আছে। এর মধ্যে আইন-কানুন অন্যতম। আর আইন-কানুন আমাদের আছে। এছাড়া সরকার সহযোগিতা করছে।

 

তিনি বলেন, ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে না। এ জন্য অনেকগুলো কারণ আছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ তাদের ধারণা এই বাজারে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। দ্বিতীয়ত ব্যাংক থেকে সহজেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো পরিশোধ করতে হয় না। এছাড়া তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করহার ব্যবধান কম।

 

তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর কোথাও নিয়ন্ত্রকসংস্থা আইপিওর দর নির্ধারণ করে না। কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দাম নির্ধারণ করে। শেয়ারবাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় দরকার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, আইডিআরএ, বিটিআরসি, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়, সেসব নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

 

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে বাধ্য করতে হবে। কারণ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কত টাকা ট্যাক্স দেয় এটা সবাই জানে। কারণ তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু ইউনিলিভার ও নেসলে বাংলাদেশে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে। তারা কত টাকা ট্যাক্স দেয় তা কেউ জানে না। কারণ তারা তালিকাভুক্ত নয়।

 

তিনি বলেন, ইউনিলিভারের সাবান লাক্স, নেসলের নুডলুস কিনছি, তারা ব্যবসা করে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের মালিকানা দিচ্ছে না। তারা কেন তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। আমরা যখন বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের দিকে দেখি তখন টপ টেনে (শীর্ষ ১০) ইউনিলিভার ও নেসলে থাকে। তাহলে আমাদের এখানে নেই কেন? ১৭ কোটি মানুষকে কি তারা মূর্খ মনে করে? এই প্রশ্নের জবাব জানতে হবে।