আলোর মুখ দেখেনি সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ /
আলোর মুখ দেখেনি সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ

বিশেষ প্রতিবেদক : মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্টের প্রয়োজন অধিক। ওষুধ তৈরি থেকে নিয়ে হাসপাতালে ওষুধের মান যাচাই, চিকিৎসক রোগীকে যে ওষুধ দিয়েছেন তা ঠিক কি না, তার বিকল্প কম দামের কোনো ওষুধ দেওয়া যায় কি না- এগুলোসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করেন একজন ফার্মাসিস্ট। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো গড়ে উঠেনি এই চর্চা। উলটো ওষুধের দোকানে থাকা ডিপ্লোমাধারীদের অনেকেই ফার্মাসিস্ট মনে করেন। অথচ গ্রাজুয়েশন শেষ করেই হতে হয় ফার্মাসিস্ট। যাদের বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে দেখা মেলে না গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। যদিও হাতে গোনা প্রথম শ্রেণির কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়া হয় ফার্মাসিস্ট।

 

কিন্তু সরকারিভাবে ফার্মাসিস্ট নিয়োগে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ফলে দেশে প্রতি বছর ৩-৪ হাজার গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বের হলেও তাদের ৮০ ভাগ সরাসরি ওষুধ উৎপাদনে কাজ করছেন। তাদের দেখা মিলছে না হাসপাতাল বা ফার্মেসিতে। ফলে দেশ ছাড়ছেন অনেক ফার্মাসিস্ট। এতে করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, স্বাস্থ্য সেবায় ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারলে রোগীরা বিশ্বমানের সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।

এর আগে ২০১৯ সালে সরকারি হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে একজন এবং প্রতি ৫০ শয্যার বিপরীতে একজন করে ফার্মাসিস্ট নিয়োগে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে সবশেষ চলতি বছরে (২০২২ সাল) মাত্র ১০ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। কিন্তু তাদের কোথায় কাজে লাগানো হবে সেটি নিশ্চিত করা হয়নি।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সামিউল সাদি বলেন, সরকারি হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়ার আবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। রিকুইজিশন শেষ হলে অল্প সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে প্রায় ৬০০ জনকে। এরপর আরও পদ খালি থাকলে আরও নিয়োগ হবে।

 

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালটির ফার্মেসিতে প্রতিদিন গড়ে সাত হাজার রোগী ওষুধ নিয়ে থাকেন। অথচ এই ফার্মেসিতে নিয়োগ পাওয়া চারজনই ডিপ্লোমাধারী। এছাড়া যারা শিক্ষানবিস আছেন তারাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী। আর ফার্মেসির প্রধান একজন চিকিৎসক।

 

আলোর মুখ দেখেনি সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ

তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে। হাসপাতালটির ফার্মেসিতে কাজ করছেন আটজন গ্র্যাজুয়েট। এছাড়া প্রতি ৩০ শয্যার বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন ফার্মাসিস্টকে। ওষুধ মজুত থেকে শুরু করে সরবরাহ, বিক্রি, যাচাই ও কাউন্সেলিংয়ে নিয়োগ পেয়েছেন মোট ৬০ জন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট।

 

এ বিষয়ে ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম বলেন, ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি মডেল ফার্মেসিগুলোতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিলে মানুষ সঠিক সেবা পাবে। সরকার এতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। ফার্মেসি কাউন্সিল নতুন ডিপার্টমেন্ট তৈরির জন্য টিওএন্ডডি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। কোভিডের কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ বিষয়ে আরও আন্তরিক হওয়া দরকার।

 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল ও কেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শাহ আমরান বলেন, একটা ঘর তৈরিতে চারটা পিলার লাগে। তেমনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হয়। একটি পিলার ছাড়া ঘর যেমন টেকবে না, তেমনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশার জন্য দায়ী হসপিটাল ফার্মাসিস্ট না থাকা। আইন করে হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করা উচিৎ। ডাক্তার রোগীকে কোনো ওষুধ দিলে সেটি ঠিক কি না, তার অলটারনেটিভ কম দামের ওষুধ রোগীকে দেওয়া যায় কি না তা ঠিক করতে পারেন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট।

 

তিনি বলেন, সারাবিশ্বে কাজের স্পেশালাইজেশন হয়েছে। ডাক্তারের কাজ ডাক্তার, ফার্মেসির কাজ ফার্মাসিস্ট, নার্সের কাজ নার্স করে। কিন্তু বাংলাদেশে ডাক্তাররাই যদি ফার্মাসিস্টের কাজ করেন তাহলে তো রোগী সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রতি বছর দেশে ৩-৪ হাজার ফার্মাসিস্ট বের হন। এদের যদি কাজের সুযোগ করে দেওয়া না হয় তারা যাবেন কোথায়। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে এখন বেকার। ওষুধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার রোধে হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ফার্মেসিকে ক্যাডার সাবজেক্ট ও হাসপাতালগুলোতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিতে হবে। তারাও বিসিএস দিয়ে নবম গ্রেডে চাকরিতে ঢুকবে। তাহলে স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত হবে।

 

আলোর মুখ দেখেনি সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ

 

বাংলাদেশে ফার্মাসিস্টদের তিনটি ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করা হয়। গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের গ্রেড এ, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের গ্রেড বি এবং ফার্মেসি টেকনিশিয়ানদের গ্রেড সি হিসেবে সনদ দেয় বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল।

 

সংস্থাটির তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে এ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট আছেন ১৭ হাজার ৯৩৭ জন, বি ক্যাটাগরিতে আছেন ৫ হাজার ৩৪৯ জন ও সি ক্যাটাগরিতে রয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৩৮ জন।

 

নোভো হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ফার্মা লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ফরিদ উদ্দিন কাওসার খান বলেন, আমাদের ভুল ধারণা হচ্ছে, ডিপ্লোমা করে যারা ওষুধ কেনাবেচা ও স্টক মেইনটেন করেন তাদের ফার্মাসিস্ট বলে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তারা আছেন। প্রকৃতপক্ষে ফার্মাসিস্ট বলতে তাদের বোঝায় যারা গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে এ গ্রেড ফার্মাসিস্টের সার্টিফিকেট নেন। এ গ্রেড ফার্মাসিস্টের পোস্ট কোনো সরকারি হাসপাতালে নেই। ১৯৯৩ সালে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, ১০ জন ফার্মাসিস্ট নিয়োগের। দীর্ঘদিন আলোচনার পর ২০১৬ সালের দিকে ১২০০ ফার্মাসিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাদের কীভাবে কাজে লাগানো হবে এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতালগুলো থেকে একটা ফাংশনাল প্ল্যান চাওয়া হয়। কিন্তু সে প্ল্যান না পাওয়ায় আর নিয়োগটা হয়নি।

 

আলোর মুখ দেখেনি সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ

 

তিনি বলেন, হসপিটাল ফার্মাসিস্টরা শুধু ওষুধ নিয়ে কাজ করেন না। তারা রোগীর প্রত্যেকটা প্রেসক্রিপশন মনিটর করেন, ফলোআপ করেন, কোনো ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, কোন স্পেসিফিক ড্রাগের মডিফিকেশন হচ্ছে কি না এ ধরনের কাজ তারা করেন। বাংলাদেশ ছাড়া সব দেশে একজন ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্টের এই তিনজনের তত্ত্বাবধান ছাড়া রোগী সঠিক ট্রিটমেন্ট পেতে পারে না।

 

 

নোভো হেলথ কেয়ার অ্যান্ড ফার্মা লিমিটেডের এই কর্মকর্তা বলেন, একজন ডাক্তারের মেডিসিন রিলেটেড কমপ্লিকেশনের বিষয়ে ধারণা নেই। রোগীকে প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়ার পর তার ডোজের কোনো কম বেশি হলে তা অ্যাডজাস্ট করতে পারেন ফার্মাসিস্ট।