আবারও প্রশিক্ষণের চিঠি সেই ২১২ এসআইকে


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৪, ২০২২, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ /
আবারও প্রশিক্ষণের চিঠি সেই ২১২ এসআইকে

ক্রাইম ট্রেস ডেস্ক : চলমান বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করছে। পুলিশ প্রশাসনও এর ব্যতিক্রম নয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নানা খাতে ব্যয় কমিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু পুলিশের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের কৃচ্ছ সাধনের নীতি উপেক্ষা করা হচ্ছে। ডিসি (ডিপার্টমেন্টাল ক্যাডেডস) কোর্স বাতিল হওয়া ২১২ পিএসআইকে আবারও প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। যেখানে ১৭ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোর্স সমাপ্ত করা যেত, সেখানে এক বছরের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ১৮ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৫ জুন থেকে ৮৬৭ জন এক বছর মেয়াদি ডিসি কোর্সের প্রশিক্ষণে ছিলেন। এ প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার পর তারা এসআই পদে চাকরি স্থায়ী হতো। পাশাপাশি পরিদর্শক পদে পদোন্নতির পরীক্ষার জন্য তারা যোগ্যতা অর্জন করতেন। কিন্তু ওই প্রশিক্ষণের একবারে শেষপ্রান্তে এসে (মাত্র ১৭ দিন বাকি থাকতে) ২০২১ সালের ২৭ মে ২১২ জন পিএসআইয়ের পুরো ডিসি কোর্স বাতিল করে দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ-ওই বছরের ১৪ মে পবিত্র ঈদের দিন তারা রোল কলে অনুপস্থিত ছিলেন।

মাত্র একদিন রোল কলে অনুপস্থিত থাকায় তাদের পুরো কোর্স বাতিলের বিষয়টিকে ওই সময় লঘুপাপে গুরুদণ্ড হিসাবে ব্যাপক আলোচিত হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন সিদ্ধান্তে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এসআইরা নিজ নিজ ইউনিটে যোগ দেন। এরপর তাদের দূরবর্তী স্থানে বদলি করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। পাশাপাশি তাদের বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চিঠি দেওয়া হয়। তাদের পুনরায় বদলির সিস্টেম লক করে দেওয়া হয়। এক বছরে তারা বারবার সুবিধাজনক স্থানে বদলির আবেদন করলেও তা নাকচ করা হয়।

বিষয়টি পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নজরে এলে সংগঠনের সভাপতি ফরমান আলী ও সাধারণ সম্পাদক মাজাহারুল ইসলাম তৎকালীন আইজিপির কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়-মাত্র এক বেলা রোল কলে অনুপস্থিত থাকায় ২১২ এসআইকে যে ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাতে তাদের কর্মস্পৃহা হারিয়ে গেছে। মানসিকভাবে তারা ভেঙে পড়েছেন। এ চিঠি পাওয়ার পর ১০ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, ২০২০ সালের ডিসি কোর্স থেকে অব্যাহতি ও শিক্ষানবিশ বাতিলসহ ২১৩ জন (২০২০ সালে ডিসি কোর্সে গড় হাজির থাকায় একজনের কোর্স বাতিল হয়, তাকেসহ) পিএসআইকে আবার পুরো ডিসি কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা ২০২২ সালের ডিসি কোর্স ব্যাচের সঙ্গে এক বছর মেয়াদি ট্রেনিং করবেন। কোর্সের নিয়ম অনুযায়ী ছয় মাস বাস্তব প্রশিক্ষণ (থানায় অবস্থান করে কাজ করা) এবং ছয় মাস মৌলিক প্রশিক্ষণ (ট্রেনিং সেন্টারে) ট্রেনিং নিতে হবে। কেউ শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে প্রশিক্ষণ থেকে অব্যাহতির আবেদন করলে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই দিনে অপর এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী ১৫ আক্টোবর থেকে ২০ তম ডিসি কোর্স শুরু হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের নতুন প্রজ্ঞাপনে ভীষণ ক্ষুব্ধ ২১২ জন পিএসআই। সন্তুষ্ট হতে পারেনি পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনও। তারা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তার রোষানলে পড়েছেন ভুক্তভোগী ২১২ জন। পিএসআইরা যে ভুল করেছেন-ওই ভুলের জন্য তাদের সর্বোচ্চ এক মাসের অতিরিক্ত ডিউটি হতে পারে। কোনোভাবে পুরো কোর্স বাতিল হতে পারে না। ১১ মাস ১৩ দিন তারা সুনামের সঙ্গে পার করেছেন। কোর্সের সমাপনী পরীক্ষাও শেষ হয়েছিল। সমাপনী কুচকাওয়াজ, সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রশিক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক পিটি-প্যারেডের সময় বাকি ছিল মাত্র কয়েক দিন। ঠিক ওই সময়ে কোর্স বাতিল করা হয়।

এ বিষয়ে পুলিশ জানতে চাইলে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, অপরাধের চেয়ে অনেক বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। রোল কলে অনুপস্থিতির শাস্তি হিসাবে ডিটেনশন (অতিরিক্ত সময় থাকা) বা এক্সটা ড্রিল (অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ) দেওয়ার চর্চা রয়েছে। কিন্তু যে ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে তার নজির নেই। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। আইজিপির সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছি। সবশেষ লিখিত আবেদনও জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে। আশা করছি নতুন আইজিপি বিষয় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন।’ জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (অর্থ) শাহাবুদ্দিন খান বলেন, বিষয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

তাই ভালোভাবে না জেনে এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২১২ জন পিএসআইকে পুরো এক বছরের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হলে সরকারের ১৮ কোটি ১৬ লাখ ৮৬ হার টাকা খরচ হবে। এর মধ্যে প্রশিক্ষণার্থীদের বেতন বাবদ ২ কোটি ২১ লাখ ১২ হাজার টাকা খরচ হবে। দুটি বোনাস বাবদ ব্যয় হবে ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ট্রনিং ভাতা/টিএ বাবদ যাবে এক কোটি ৬৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া মেডিকেল ও চিকিৎসা বাবদ ১৪ লাখ ৮৪ হাজার, প্রশিক্ষকের (৩০ জন) বেতন বাবদ ৯৯ লাখ, প্রশিক্ষকদের বোনাস বাবদ সাত লাখ ৫০ হাজার; বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও আবাসন বাবদ ২০ লাখ এবং রেশন সামগ্রী ও অন্য সরকারি মালামাল সরবরাহ বাবদ আনুমানিক দুই কোটি টাকা খরচ হতে পারে।