দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি, কোন পথে পটুয়াখালী আওয়ামী লীগ


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২০, ২০২২, ১২:০০ অপরাহ্ণ /
দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি, কোন পথে পটুয়াখালী আওয়ামী লীগ

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল : পটুয়াখালী জেলা পরিষদ নির্বাচনেও হেরে গেল আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এর আগে উপজেলা থেকে পৌরসভা, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দল বেঁধে হেরেছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। অথচ এসব নির্বাচনের কোনোটিতেই অংশ নেয়নি বিএনপি। এতে একদিকে যেমন প্রশ্ন উঠেছে দলীয় মনোনয়ন ও নেতাকর্মীদের ঐক্য নিয়ে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নেতাদের কোন্দলের বিষয়টিও চলে এসেছে সামনে।

একের পর এক দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য এরা এখন দায়ী করছেন একে অপরকে। জেলা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগের পাশাপাশি বহু বছর ধরে এক পরিবারের হাতে দল জিম্মি থাকার বিষয়টিও সামনে আনছেন অনেকে।

১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে পটুয়াখালীতে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় মুুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান মোহনকে। আগের নির্বাচনেও তাকেই দেওয়া হয়েছিল মনোনয়ন। সে সময় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন তিনি। এবার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মাঠে নামেন পটুয়াখালী যুবলীগের নেতা হাফিজুর রহমান।

শুরুর দিকে প্রার্থী হিসাবে তেমন গুরুত্ব না পাওয়া সেই হাফিজ-ই শেষ পর্যন্ত করেন বাজিমাত। প্রায় একশ ভোটের ব্যবধানে মোহনকে হারিয়ে দেন তিনি। এর আগে ২০১৯ সালে পটুয়াখালী পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে দলের প্রভাবশালী প্রার্থী বর্তমান জেলা সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেনকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন বিদ্রোহী মহিউদ্দিন আহম্মেদ। বিপুল ভোটে জিতে মহিউদ্দিন যে সংকেত দিয়েছিলেন তার ধারাবাহিকতাই যেন জেলা পরিষদেও প্রতিফলিত হলো।

২০২০ সালে অনুষ্ঠিত কুয়াকাটা পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী তৎকালীন পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লাকে হারিয়ে জয়ী হন বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন। আগের বছর মির্জাগঞ্জ ও রাঙ্গাবালী উপজেলার নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থীদের হারিয়ে জয়ী হন দলের বিদ্রোহীরা। মির্জাগঞ্জে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দলীয় প্রার্থী গাজী আতাহার উদ্দিন আহম্মেদকে পরাজিত করেন বিদ্রোহী খান মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক। রাঙ্গাবালীতে বিদ্রোহী প্রার্থী ডাক্তার জহিরউদ্দিন আহম্মেদের কাছে হেরে যান দলীয় প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জেলার ১২টি ইউনিয়নের দখল নেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী এবং স্থানীয় পর্যায়ে কোন্দলসহ নানা কারণে ২ ইউনিয়নে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘এখানে দলের বর্তমান সংসদ-সদস্য মুহিববুর রহমান। আগে ছিলেন সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান। মনোনয়ন ধরে রাখা আর ফিরে পাওয়া নিয়ে এই দুজনের ধারায় বিভক্ত আওয়ামী লীগ। চলে একে অপরকে ছোট করার লড়াই। কোনো এক প্রার্থীকে একজন সমর্থন দিলে অন্যজন চলে যায় বিপক্ষে। এই নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই পরাজিত হয় দলীয় প্রার্থীরা।

কলাপাড়ার চিত্রই যেন পটুয়াখালীজুড়ে। বাউফলে ২০১২ সালে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে পৌর মেয়র পদে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন জিয়াউল হক জুয়েল। তখন থেকেই তার বিরোধ সেখানকার সংসদ-সদস্য আ.স.ম ফিরোজের সঙ্গে। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে অবশ্য দলীয় মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র হয়েছেন জুয়েল।

ফিরোজ ও জুয়েলের এ বিরোধে নতুন মাত্রা এনেছেন সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব হাওলাদার। তিনিও এখন এমপি ফিরোজের বিরোধী পক্ষ। পৌর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘জুয়েল আর মোতালেব মিলে একাট্টা এমপি ফিরোজের বিরুদ্ধে। যার প্রভাব পড়ে নির্বাচনে। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়াই কেবল নয়, সমর্থনের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সব রকম চেষ্টাও করেন এসব নেতা। ফলে ডুবে যায় নৌকা। এভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক যত গোলমাল তা এখন আওয়ামী লীগের মধ্যেই হচ্ছে।’

সংসদীয় আসন ও উপজেলাভিত্তিক দ্বন্দ্ব-কোন্দলের পাশাপাশি বিপর্যয়ের জন্য জেলা নেতাদের বিভক্তিকেও দায়ী করছেন অনেকে। তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছিল সদর আসনের বর্তমান এমপি শাহজাহান মিয়া ও তার পরিবারের হাতে। প্রায় ২৫ বছর জেলা সভাপতি ছিলেন শাহজাহান। তার শাসনামলে মৃধা পরিবারের বাইরে বলতে গেলে পটুয়াখালী আওয়ামী লীগে কিছুই ছিল না। তার এক ছেলে পৌর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. তারিকুজ্জামান মনি ছিলেন সদর উপজেলার চেয়ারম্যান। টানা সাড়ে ৮ বছর যুবলীগের আহবায়ক ছিলেন আরেক ছেলে আরিফুজ্জামান রনি। দলের প্রায় সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বেও ছিলেন এই পরিবারের সদস্যরা। আওয়ামী একাধিক নেতাকর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে দলে গণতন্ত্রের চর্চা নষ্ট করে এরা। নিজস্ব বলয়ের বাইরে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে দেওয়া হয় বাধা। ফলে একদিকে যেমন তৈরি হয় বন্ধ্যত্ব, তেমনি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দল।

একের পর এক নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর বলেন, ‘পৌর নির্বাচনে আমার পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল দলের বিশাল অংশের নিষ্ক্রিয়তা। জেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি যুবলীগসহ, তখন যারা দল নিয়ন্ত্রণ করতেন তারা সবাই চেয়েছেন আমার পরাজয়। সে সময় যিনি পৌরসভায় জিতেছেন আজ তার বন্ধু হয়েছেন জেলা চেয়ারম্যান। এরা যেভাবে পরিকল্পিতভাবে আগাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে সংসদ-সদস্য পদ দখল করলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

কাজী আলমগীর আরও বলেন, এই বিষবৃক্ষের বীজ বপন হয়েছে ২০১৯ সালে পৌর নির্বাচনে। তাছাড়া জেলা পরিষদে এখানে যাকে প্রার্থী করা হয়েছিল এই মনোনয়নটাও ঠিক ছিল না। টানা ৫ বছর জেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কোনো সখ্য তৈরি করতে পারেননি আমাদের প্রার্থী। এখনো লোকজন তাকে ঠিকমতো চেনেন না। তার ওপর তিনি ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। চাঁদা তুলে আমরা তার নির্বাচন চালিয়েছি। অপরদিকে প্রতিপক্ষ কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছে। ‘সবার উপরে দল’ এই নৈতিকতা না আসা পর্যন্ত বিপর্যয় দেখতেই হবে।’

জেলা পরিষদে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে সদর আসনের বর্তমান সংসদ-সদস্য শাহজাহান মিয়ার ছেলে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. তারিকুজ্জামান মনি বলেন, ‘এটা তো পুরো জেলার ব্যাপার। আমি তো পৌর এলাকার দায়িত্বে। নির্বাচনে নামার পর যখন দেখলাম দলের অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে তখন আমি পৌর আওয়ামী লীগের ৩ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। পৌর আওয়ামী লীগের মতো জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে যারা দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছে তাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি হতো না।’ জেলার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। যু গা ন্ত র