জুমার প্রথম খুতবা : দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২১, ২০২২, ১:২৪ অপরাহ্ণ /
জুমার প্রথম খুতবা : দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়

ইসলাম ডেস্ক : আজ শুক্রবার। জুমার দিন। ২১ অক্টোবর ২০২২ ইংরেজি, ০৫ কার্তিক ১৪২৯ বাংলা, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি। আজ রবিউল আউয়ালের শেষ জুমা। আজকের জুমার আলোচ্য বিষয়- দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়। এ প্রসঙ্গে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী?

 

সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি একক, তার কোনো অংশীদার নেই। যিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। যার পরে আর কোনো নবি নেই। আজ রবিউল আউয়াল মাসের শেষ জুমা। কেয়ামত আগে অবশ্যই দাজ্জাল আসবে। আরও কিছু ঘটনা ঘটবে, সে সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু দিকনির্দেশনা ঘোষণা করেছেন। আবার দাজ্জালের ভয়াবহ ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়ও ঘোষণা করেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে এভাবে আশ্রয় চাইতে বলেছেন-

اَللَّهُمَّ اِنِّي اَعُوْذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْح الدَّجَّال
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উজুবিকা মিন ফেতনাতি মাসিহুদ দাজ্জাল।’ (বুখারি)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অভিশপ্ত দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই।’

দাজ্জালের আগমণের আগ মুহূর্তে মুসলমানদের অবস্থা খুব ভাল থাকবে। তারা পৃথিবীতে শক্তিশালী এবং বিজয়ী থাকবে। সম্ভবত এই শক্তির পতন ঘটানোর জন্যই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।

 

কেয়ামতের আগে দুনিয়াতে দাজ্জালের আবির্ভাব এক বিরাট ফেতনা। আল্লাহ তাআলা তাকে অনেক বড় বড় আশ্চর্য রকমের ঘটনা ঘটানোর শক্তি ও সামর্থ্য দান করবেন। যার ফলে সাধারণ মানুষের চিন্তা-শক্তিতে বিশাল এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে। ফলে মানুষ কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে পড়বে।

 

দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে?
দাজ্জাল বের হওয়ার স্থান সম্পর্কেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, সে পূর্ব দিকের পারস্য দেশ থেকে বের হবে। সে স্থানটির নাম হবে খোরাসান। সেখান থেকে বের হয়ে সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করবে। তবে মক্কা এবং মদিনায় প্রবেশ করতে পারবেনা। ফেরেশতাগণ সেদিন মক্কা-মদীনার প্রবেশ পথসমূহে তরবারি নিয়ে পাহারা দেবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আগে কোনো একটি দেশ থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে যার বর্তমান নাম খোরাসান।’ (তিরমিজি, কিতাবুল ফিতান)

 

মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না দাজ্জাল
বিশুদ্ধ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী দাজ্জালের জন্য মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। মক্কা ও মদিনা ছাড়া পৃথিবীর সব স্থানেই সে প্রবেশ করবে। হজরত ফাতেমা বিনতে কায়েস রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে,ম এরপর দাজ্জাল বললো, আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভেতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদিনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ফেরেশতাগণ আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদিনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দেবে।’ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

সে সময় মদিনা মুনাওয়ারা তিনবার কেঁপে উঠবে এবং প্রত্যেক মুনাফেক এবং কাফেরকে বের করে দেবে। যারা দাজ্জালের কাছে যাবে এবং তার ফেতনায় পড়বে তাদের অধিকাংশই হবে নারী। দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচানোর জন্য পুরুষেরা তাদের স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা, ফুফু এবং অন্যান্য স্বজন নারীদের রশি দিয়ে বেঁধে রাখবে।

দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন থাকবে?
সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছেন, দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে তিনি বলেছেন, সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান লম্বা। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের সমান। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের সমান। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতই হবে। আমরা বললাম, যে দিনটি এক বছরের সমান দীর্ঘ হবে সে দিন কি এক দিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে নামাজ পড়বে।’ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

দাজ্জালের অনুসরণ করবে কারা?
দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদি, তুর্কী এবং অনারব লোক। তাদের অধিকাংশই হবে গ্রাম্য মূর্খ এবং নারী। ইহুদিরা মিথ্যুক কানা দাজ্জালের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দাজ্জাল হবে তাদের বাদশা। তার নেতৃত্বে তারা বিশ্ব পরিচালনা করবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদি এবং নারী।’ (মুসনাদে আহমাদ)
তিনি আরো বলেছেন, ‘ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদি দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের সবার পরনে থাকবে সেলাই বিহীন চাদর।’ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

 

দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ফেতনা থেকে বেঁচে থাকার উপায়ও বলে দিয়েছেন। তিনি উম্মাতকে একটি সুস্পষ্ট দ্বীনের উপর রেখে গেছেন। সকল প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং সকল অকল্যাণের পথ থেকে সতর্ক করেছেন। উম্মাতের উপরে যেহেতু দাজ্জালের ফেতনা সবচেয়ে বড় তাই তিনি দাজ্জালের ফেতনা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং দাজ্জালের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। যাতে মুমিন বান্দাদের জন্য এই প্রতারক, ধোকাবাজ ও মিথ্যুক দাজ্জালকে চিনতে কোনরূপ অসুবিধা না হয়।

 

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে এভাবে আশ্রয় চাইতে বলেছেন-

اَللَّهُمَّ اِنِّي اَعُوْذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْح الدَّجَّال
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উজুবিকা মিন ফেতনাতি মাসিহুদ দাজ্জাল।’ (বুখারি)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অভিশপ্ত দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই।

প্রিয় মুসল্লিগণ, প্রতিটি বিজ্ঞ মুসলিমের উচিৎ তার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিবার এবং সকল নারী-পুরুষদের জন্য দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিসগুলো বর্ণনা করা। বিশেষ করে ফেতনায় পরিপূর্ণ আমাদের বর্তমান যামানায়। দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার উপায়গুলো হলো-

 

১. আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের মাধ্যমে। বিশেষ করে নামাজের তাশাহহুদে দাজ্জালের ফেতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। আবার দাজ্জালের আগমনের সময় পলায়ন করেও দাজ্জালের ফেতনা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

২. ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরা
ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরা এবং ঈমানের উপর অটল থাকাই দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যে মুমিন আল্লাহর নাম ও তাঁর অতুলনীয় সুমহান গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে সে অতি সহজেই দাজ্জালকে চিনতে পারবে। সে দেখতে পাবে দাজ্জাল খায় পান করে। মুমিনের আকীদা এই যে, আল্লাহ তাআলা পানাহার ও অন্যান্য মানবীয় দোষ-গুণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে পানাহারের প্রতি মুখাপেক্ষী সে কখনও আল্লাহ বা রব হতে পারেনা।

 

৩. দাজ্জাল অন্ধ হবে
আল্লাহ তাআলা সব দোষ-ত্রুটির উর্ধে। আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অধিকারী মুমিনগণের মনে প্রশ্ন জাগবে যে নিজের দোষ থেকে মুক্ত হতে পারেনা সে কিভাবে প্রভু হতে পারে? মুমিনের আকিদা এই যে, আল্লাহকে দুনিয়ার জীবনে দেখা সম্ভব নয়। অথচ মিথ্যুক দাজ্জালকে মুমিন-কাফের সবাই দুনিয়াতে দেখতে পাবে।

 

৪. দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় পাওয়ার দোয়া
হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, ‘আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামাজের ভেতরে দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শুনেছি। (বুখারি, কিতাবুল ফিতান)

 

তিনি নামাজের শেষ তাশাহুদে বলতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কাবরি ওয়া মিন আজাবিন নারি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাতি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জালি।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আজাব, জাহান্নামের আজাব, জীবন-মরণের ফেতনা এবং মিথ্যুক দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই।’ (বুখারি, কিতাবুল জানায়েজ)

 

৫. দাজ্জাল থেকে দূরে থাকা
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন। কারণ সে এমন একজন লোকের কাছে আসবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। দাজ্জালের কাজ-কর্ম দেখে সে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে। মুমিনের জন্য উত্তম হলো সম্ভব হলে সে সময়ে মদিনা অথবা মক্কায় বসবাস করার চেষ্টা করা। কারণ দাজ্জাল তথায় প্রবেশ করতে পারবে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের কাছে যাবে যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। এরপর সে দাজ্জালের সঙ্গে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিষগুলো ও তার কাজ-কর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে।

 

৬. সুরা কাহফ পড়া
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের ফেতনা থেকে বেঁচে থাকতে মুমিনদেরকে সুরা কাহাফ মুখস্থ করতে এবং তা পাঠ করতে আদেশ করেছেন। নবিজি সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জালের ফেতনা থেকে হেফাজতে থাকবে।’ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

 

আজ জুমার দিন। দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচতে প্রতি জুমাবারে সুরা কাহফ তেলাওয়াত করে হাদিসের ওপর আমল করা জরুরি। হাদিসে পাকে আরও যেসব আমলের কথা বলা হয়েছে সেসব আমলে গঠন হোক মুমিনের জীবন।

 

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহ ভয়াবহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। কোরআন-সুন্নাহর আমলে নিজেদের গঠন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।