রাজাপুরে আশ্রয়ণের ঘরেও ‘কেয়ারটেকার’


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৪, ২০২২, ১:২১ অপরাহ্ণ /
রাজাপুরে আশ্রয়ণের ঘরেও ‘কেয়ারটেকার’

স্টাফ রিপোর্টার, ঝালকাঠি : রাজাপুর উপজেলার কৈবর্তখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩১ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন মজিবর রহমান। অথচ রাজাপুর সদরের বলাইবাড়ি এলাকার নিজ বাড়িতেই থাকেন তিনি! আশ্রয়ণের ঘরটির কেয়ারটেকার তার চাচাতো ভাই ইসমাইল। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেই ঘরে বসবাস করছেন তিনি।

ইসমাইল-ফাতেমা দম্পতির পরিবারে চার মেয়ে। তাদের কোনো ছেলেসন্তান নেই। চট্টগ্রামে থাকাকালীন বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দেন পটুয়াখালী ও বরগুনায়। স্ত্রী ও ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামে থাকতেন তিনি। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর মজিবর তাদের চট্টগ্রাম থেকে কৈবর্তখালী নিয়ে আসেন। ইসমাইলের স্ত্রী ফাতেমা বেগম জানান, গত বছরের ৫ ডিসেম্বর থেকে তারা আশ্রয়ণের এই ঘরে বসবাস করছেন।

অন্যদিকে ৯০ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ হয় পিয়ারা বেগমের নামে। উপজেলা প্রশাসন থেকে ঘরটি বুঝে নেওয়ার পর হাবিব নামের একজনকে দেখাশোনার জন্য সপরিবারে থাকতে দেন তিনি। হাবিব একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তারও নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নেই। কিশোরী কন্যাসহ ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন হাবিব। ওই ঘরের সামনে এখনও হাবিবের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা আছে। মেয়েকে ভালো পাত্রের কাছে বিয়ে দিতে ওই ঘরটি ছেড়ে উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছেন তিনি।

এরপর ফারুক নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে থাকতে দেন পিয়ারা বেগম। সম্প্রতি ফারুকের বিরুদ্ধে রিকশা চুরির অভিযোগ ওঠে। এরপর গত ১২ নভেম্বর ফারুকও ওই ঘর ছেড়ে চলে যান। এখন ওই ঘরটি খালি পড়ে আছে। আশ্রয়ণের ঘরের দেখাশোনার জন্য আর কাউকে পাননি পিয়ারা বেগম!

৮৫ নম্বর ঘরটি কার নামে বরাদ্দ তা জানেন না প্রতিবেশীরাও। তারা ঘরটি দেখিয়ে বলেন, আমরা কয়েকটি পরিবার এখানে বসবাস করছি। ওই ঘরটি বরাদ্দের পরে এখন পর্যন্ত কাউকে আসতে দেখিনি। কার নামে বরাদ্দ তাও জানি না। সবসময় তালা দেওয়াই থাকে।

রাজাপুর সদর ইউনিয়নের আনসার কমান্ডার আ. শুক্কুরের নামে ২১ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ রয়েছে। তার ছেলে মেহেদী মাঝে মধ্যে ওখানে রাতযাপন করেন। নিয়মিত কেউ থাকেন না ওই ঘরে। আরেক আনসার সদস্য মোজাম্মেল ও তার স্ত্রীর নামে ১৫০ ও ৩৭১ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ রয়েছে। তারা দুজন দুটি ঘরে থাকছেন। সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মুজিববর্ষ উপলক্ষে জেলায় ২১৯টি আশ্রয়ণের ঘর রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৮৮টি, নলছিটি উপজেলায় ১১০টি এবং রাজাপুর উপজেলায় ২১টি।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার তথ্যানুযায়ী মুজিববর্ষে গৃহহীন উপকারভোগী ১ হাজার ৪৮২ জন। প্রথম পর্যায়ের ৪৭৪টি ঘরের সদর উপজেলায় ৫১টি, নলছিটি উপজেলায় ৪০টি, রাজাপুর উপজেলায় ৩৩৩টি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলায় ৫০টি। দ্বিতীয় পর্যায়ের ৪৭২টি ঘরের সদর উপজেলায় ১২টি, নলছিটি উপজেলায় ৯৫টি, রাজাপুর উপজেলায় ৩৭টি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলায় ৩২৮টি। তৃতীয় পর্যায়ের ৬৮০টি ঘরের সদর উপজেলায় ১৩৮টি, নলছিটি উপজেলায় ৩০২টি, রাজাপুর উপজেলায় ১৪১টি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলায় ৯০টি। চতুর্থ পর্যায়ে নতুন ২১৬টি ঘরের বরাদ্দ এসেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১১৮টি, নলছিটি উপজেলায় ৪৮টি, রাজাপুর উপজেলায় ৫০টি বরাদ্দ রয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রাপ্ত বরাদ্দ অনুযায়ী নির্মিত ঘর সুবিধাভোগী গৃহহীনদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ের বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘরের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ে বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘরের নির্মাণকাজ শিগগির শুরু করা হবে। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রাজাপুর উপজেলার কৈবর্তখালী আশ্রয়ণের ৩১ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম জানান, আমার স্বামী ছোট থাকতেই তার বাবা স্বাধীনের সময় মারা যান। ছোট সন্তান নিয়ে শাশুড়ি উপজেলার তুলাতলা এলাকার ওই ঘরেই থাকতেন। পরে দুষ্কৃতকারীরা ঘরে আগুন দিয়ে আমার শাশুড়িকে নামিয়ে দিয়ে বসতভিটা দখল করে নেয়। বিভিন্ন বাড়িতে থাকতে থাকতে বছরখানেক পরে শাশুড়ি মারা গেলে স্বামী ইসমাইল এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে খেয়ে না খেয়ে বড় হতে শুরু করে।

এরপরে সে চট্টগ্রাম চলে যায়। সেখানে আমাদের বিবাহ হয়। আমরা দুজনই উপার্জন করতে থাকি। এরই মধ্যে আমাদের চারটি কন্যাসন্তান হয়। উপার্জনে যা জমিয়েছিলাম তা বড় দু’মেয়ে বিয়ে দিতেই শেষ হয়ে গেছে। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে ভাসুর মজিবর আমাদের এখানে থাকার জন্য চট্টগ্রাম থেকে আসতে বলেন। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর থেকে আমরা এখানে বসবাস শুরু করি। কয়েক মাস পরে ভাসুর মজিবর এসে আমাদের ঘর খালি করার জন্য বললে আমরা উপায়হীন এবং ঋণগ্রস্ত বলে এখানেই আছি। আমরাও ঘরের জন্য আবেদন করেছি, ঘর পেলেই ছেড়ে সেখানে যাবো।

৮৬ নং ঘরের বাসিন্দা আক্কেল আলী জানান, আবাসনে বসবাস করলে তাদের সমাজ ভিন্ন চোখে দেখে। ঘরে কোনো বিবাহযোগ্য মেয়ে থাকলে ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারে না। তাই পিয়ারা বেগমের ৯০ নম্বর ঘরে হাবিব থাকলেও মেয়ের বিয়ে দিতে এখান থেকে চলে যান। পরে বারেক নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ী থাকলেও তিনি রিকশা চুরির দায়ে কয়েকদিন আগে চলে গেছেন। ৮৫ নম্বর ঘরে কেউ থাকে না। কার নামে বরাদ্দ তাও জানি না। আমরা একবছরের বেশি সময় ধরে এখানে থাকছি কিন্তু ওই ঘরের কাউকে এখন পর্যন্ত দেখছি না।

রাজাপুর উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির আ. রহিম জানান, ওই ঘরগুলোতে আমরা খোঁজ নেব। প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তরা না থাকলে পরে ব্যবস্থা নেব। কিন্তু ওইসব ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান খান ভিডিও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের কাছেও কিছু অভিযোগ আছে। আমরা মাঝে মধ্যে হঠাৎ পরিদর্শনে যাই। কিন্তু ৩১, ৮৫ ও ৯০ নম্বর ঘরের তথ্যের সঙ্গে আমাদের তথ্য মিলছে না। যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাজমুল আলম ভিডিও বক্তব্য দিতে রাজি না হয়ে জানান, যাদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারা যদি ওই ঘরে না থাকেন তাহলে তাদের বরাদ্দ বাতিল করে অন্য অসহায়দের নাম অন্তর্ভুক্ত করে বরাদ্দ দেওয়া হবে।