রেশন বিতরণে সাড়ে ৩ কোটি টাকার অনিয়মের চলমান তদন্তে ধীরগতি


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৬, ২০২২, ৬:২৭ অপরাহ্ণ /
রেশন বিতরণে সাড়ে ৩ কোটি টাকার অনিয়মের চলমান তদন্তে ধীরগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঝালকাঠি জেলা পুলিশের রেশন বিতরণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার অনিয়মের চলমান তদন্তে ধীর গতির অভিযোগ উঠেছে।

 

এ ঘটনায় ৫ পুলিশ কর্মকর্তা ও ৬ কনস্টেবলসহ ১১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

 

 

তাঁদের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামালা চলমান রয়েছে। বরখাস্তকৃত পুলিশের এসব সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে জেলার রেশন বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ২৫৩টি ভূয়া কার্ডের মাধ্যমে গত ১৯ সাল থেকে সাড়ে তিন বছরে অনৈতিক ভাবে রেশন তুলে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

 

 

গত জুন মাসে তদন্তের পরে অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ে। জুলাই মাসে রেশন বিতরণে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১১ পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলকে সনাক্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় একই মাসে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল। তবে ঘটনাটির বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করায় এতদিন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি একটি সূত্র থেকে এ বিষয়ে তথ্য পাবার পর অনুসন্ধানে বিষয়টি বেরিয়ে আসে।

 

 

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ৫ পুলিশ কর্মকর্তা হলেন, ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক মো. মামুন (বর্তমানে খুলনায় কর্মরত), উপ পরিদর্শক (এসআই) মো. আরিফ (বর্তমানে বরিশালে কর্মরত), (এসআই) মো. রেজাউল, (এসআই) মো. রাাজিউজ্জামান, সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) মো. আলাউদ্দিন (পুলিশ লাইনের সাবেক ম্যাচ ম্যানেজার)। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ৬ পুলিশ কনস্টেবল হলেন, মো. সাইফুল, মো. মেহেদী, মো. আতিক, মো. তৌফিক, মো. জসিম ও মো. জহির (ওজনদার)। এদের মধ্যে কনস্টেবল মো. আতিক পুলিশ লাইনস মসজিদের ইমামতি করতেন।

 

ঝালকাঠি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি জেলায় কর্মরত ৮৮৬ জন পুলিশ সদস্যদের (থানা, ট্রাফিক, ডিবি, ডিএসবি, সিআইডি, কোর্ট পুলিশসহ) জেলা পুলিশ লাইন থেকে মাসিক রেশন দেওয়া হয়।

 

 

একজন নতুন পুলিশ সদস্য অবিবাহিত অবস্থায় চাল ১১ কেজি, ডাল সাড়ে ৩ কেজি, তেল ৩ কেজি, আটা ১২ কেজি ও চিনি ১ কেজি ৭৫০ গ্রাম রেশন পায়। দুই সদস্যের স্বামী-স্ত্রী রেশন পায়, চাল ২০ কেজি, ডাল সাড়ে ৫ কেজি, তেল সাড়ে ৪ কেজি, চিনি ৩ কেজি ও ২০ কেজি আটা। এক সন্তানসহ তিন সদস্যের পারিবার রেশন পায়, চাল ৩০ কেজি, ডাল ৭ কেজি, তেল ৬ কেজি, চিনি ৪ কেজি ও আটা ২৫ কেজি। চার সদস্যের পরিবার রেশন পায়, চাল ৩৫ কেজি, ডাল ৮ কেজি, তেল ৮ কেজি, চিনি ৫ কেজি ও আটা ৩০ কেজি। পুলিস সদস্যদের অনেকে নিজ জেলা থেকে রেশন উত্তোলণ করে। আবার বদলী হলে নতুন কর্মস্থল থেকে রেশন তোলার নিয়ম রয়েছে।

 

 

কিন্তু রেশন বিতরণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন সময় বদলী হওয়া পুলিশ সদস্যদের ৪ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের ২৫৩ কার্ডের বিপরীতে রেশন উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতির সুযোগে ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত এসব কার্ডের বিপরীতে রেশন উত্তোলন করা হয়েছে। যাদের নামে উত্তোলন করা হয়েছে তাঁরা অন্যত্র বদলী হয়ে সেখান থেকে রেশন উত্তোলন করে যাচ্ছেন। এসব অনিয়মের বিষয়ে সেই পুলিশ সদস্যরা কিছইু জানেন না।

 

 

ঝালকাঠির সাবেক পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন গত ২৩ আগষ্ট বদলী হওয়ার আগে বিষয়টি বরিশালের ডিআইজির নজরে আনেন। পরে ডিআইজি এস.এম আক্তারুজ্জামনের নির্দেশে জুন মাসের তদন্তে বিষয়টির সত্যতা মেলে। পরে জুলাই মাসে ১১ পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। বিষয়টি তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) প্রশান্ত কুমার দে। তাঁর চাকুরীর মেয়াদ চলতি বছরের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখ শেষ হয়ে গেছে। তিনি তদন্ত কার্যক্রমকে বেশী দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তৎকালিন পুলিশ সুপার ঝালকঠিতে তিন বছর দুই মাস কর্মরত ছিলেন। তাঁর সময়কালে এ অনিয়মটি বেশি হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

 

পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে গত ১৯ সাল থেকে সাড়ে তিন বছরে ২৫৩টি ভূয়া কার্ডের মাধ্যমে রেশন তুলে আত্মসাৎ করা ভোগ্য পন্যের তৎকালীন বাজার মূল্য প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। চার সদস্যের একটি কার্ডের মাসিক রেশনের পণ্যের দাম ধরা হয়েছে ৩ হাজার টাকা। একটি কার্ডের বাজার মূল্য ৩ হাজার টাকা ধরে ৪২ মাসের হিসেবে হয় ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। সে হিসেবে ২৫৩টি কার্ডের বাজার মূল্য দাড়ায় প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এদিকে সাময়কি বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যদের অনেকেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁদের অনেকের ভাষ্যমতে দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রেশন বিতরণের মাষ্টাররোল ও রেজিষ্টার খাতা লেখায় সহায়তা করার কারণে অনেকে ফেঁসে গেছেন।

 

 

এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপ পরিদর্শক (এসআই) মো. রাজিউজ্জামান বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকেই রেশন বিতরণের হিসেব নিকাশে গরমিল ছিল। তারপরেও আমরা পুলিশ বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সঠিক ভাবে তদন্ত হলে আমরা নির্দোষ প্রমানিত হবো।

 

 

কনস্টেবল মো. সাইফুল বলেন, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোন কথা বলা যাবে না।

 

 

জেলা পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রমানীত হলে দোষীদের বিরুেেদ্ধ কঠোর আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অনিয়ম ঠেকাতে বর্তমানে রেশন বিতরণের এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।