পদ্মা সেতুর সুফলে বদলে যাচ্ছে বরগুনার পর্যটন ও মৎস্য সেক্টর


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২৩, ২০২৩, ৩:৪৩ অপরাহ্ণ /
পদ্মা সেতুর সুফলে বদলে যাচ্ছে বরগুনার পর্যটন ও মৎস্য সেক্টর

স্টাফ রিপোর্টার, বরগুনা: দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নাম শুনলেই মানুষের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি জাগে। সবার মনে জাগে নানা প্রশ্নও। কী নেই পদ্মার পাড়ে? কী নেই দেশের দক্ষিণাঞ্চল উপকূলীয় জেলাগুলোতে? পর্যটন, মৎস্য সেক্টরসহ আছে নানা সম্ভাবনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থল থেকে শুরু করে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা, সমুদ্রবন্দর পায়রা, শেরেবাংলার জন্মভূমি এবং অপার সৌন্দর্যের বিস্তীর্ণ উপকূল।

প্রচুর সম্ভাবনা আর ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর এ রকম অসংখ্য স্থাপনা বুকে ধারণ করলেও কেবল প্রমত্তা পদ্মার কারণে সবকিছুই যেন ছিল নক্ষত্র সমান দূরত্বে। বিশাল নদী পাড়ির ঝক্কি এড়াতে অনেকেই আসতে চাইতেন না দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায়। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যুগের পর যুগ পিছিয়ে থাকার সেই কষ্ট দূর হয়েছে পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের ২৫ জুন উদ্বোধন হয় স্বপ্নের পদ্মাসেতু। এ সেতুকে ঘিরে এখন শিল্পবাণিজ্য আর পর্যটন খাতে নয়াবিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের মানুষ। এর বাইরে নেই উপকূলবর্তী সুন্দরবন ঘেষা বরগুনা জেলাও। এ জেলায়ও রয়েছে পর্যটন ও মৎস্য সেক্টরসহ নানা সম্ভাবনা। পর্যটন এবং মৎস্য সেক্টরকে কেন্দ্র করে বরগুনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এখন সময়ের দাবি।

বরগুনার পর্যটন সম্ভাবনাময়: বরগুনা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। বরগুনা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা চার নদী বিষখালী, বলেশ্বর, বুড়িশ্বর এবং নীলগঞ্জের নীল নদী। নদ-নদীতে খোলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝাউবন। বাতাসের ছোঁয়ায় প্রেমিকার উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ঝাউগাছগুলো। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝাউগাছ এ যেন দৃষ্টিনন্দন এক সৈকত! সমুদ্রের মৃদু ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউবনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি যেন প্রকৃতি প্রেমের একটি উদাহরণ।

শুধু তাই নয়, এ জেলায় রয়েছে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত, সোনাকাটা ইকোপার্ক, হরিণঘাটা, মোহনা পর্যটন কেন্দ্র, বিবিচিনি শাহী মসজিদ, বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, তালতলীর রাখাইন পল্লী, বেতাগীর খ্রিস্টান পল্লী, কাউনিয়া জমিদার বাড়ি, সিডর স্মৃতিস্তম্ভ, বিহঙ্গ দ্বীপ, নীলিমা পয়েন্ট, কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র, সুরঞ্জনা, জোৎস্না উৎসব, ইলিশ উৎসব। এছাড়াও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে রয়েছে মুজিব অঙ্গন, ইলিশ চত্বর, বিউটি অব বরগুনা, টাউন হল সংলগ্ন অগ্নিঝরা একাত্তর, সার্কিট হাউজ সংলগ্ন ইলিশ ফোয়ারা কেন্দ্রিক উন্মুক্ত ময়দান। রয়েছে পাথরঘাটায় দেশের বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, বিষখালী নদীর সাদের ইলিশ। একদিকে সীমাহীন সাগর; আরেক দিকে দীর্ঘ ঝাউবন, তিন তিনটি নদীর বিশাল জলমোহনা। সব মিলিয়ে নদ-নদী আর বন-বনানীর এক অপরূপ সমাহার-শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতেই জোৎস্না উৎসব পালিত হয়ে থাকে। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে ছিল পর্যটন খাত। তবে পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে এ খাত পরিবর্তন হচ্ছে। পদ্মাসেতু হওয়ায় সড়ক পথে আসা যাওয়া সহজ হওয়ায় পর্যটক বৃদ্ধির পাশপাশি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজস্ব।

পর্যটন উদ্যোক্তা মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ, সোহেল হাফিজ, শফিকুল ইসলাম খোকন ও আরিফুর রহমান বলেন, জেলা পর্যায়ের পর্যটন শিল্পকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও গুরুত্ব প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। স্থানীয় আগ্রহী তরুণদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের আশে পাশের অব্যবহৃত সরকারি খাস জমি বন্দবস্ত দিয়ে কমিউনিটি বেইজড্ এগ্রো ট্যুরিজম স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়া গেলে পর্যটন শিল্পে একটি বড় ধরণের সুযোগ তৈরি হতো।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই বেড়েছে বরগুনার কদর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ায় স্বপ্ন বুনতে শুরু করে বরগুনার অবহেলিত মানুষ।

বরগুনার মৎস্য সম্ভাবনাময়: বরগুনার কথা শুনলেই মনে হয় মৎস্য ভান্ডার, ইলিশসহ মাছের রাজ্য; উপকূলীয় জেলা বরগুনায় সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ হয়ে থাকে। পাশাপাশি বলেশ্বর, পায়রা নদী ও বিষখালী নদ এবং খাল-বিলে মাছধরা জেলের সংখ্যাও অনেক। বঙ্গোপসাগরসহ নদ-নদীর মাছ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা হচ্ছে। পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় মাছ ব্যবসায় আসে আমূল পরিবর্তন। যার সুফল পেতে শুরু করেছে ব্যবসায়ী, পাইকার, জেলে ও মৎস্য শ্রমিকরা।

পাথরঘাটা মৎস্য বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩৭০, ২০১৯-২০২০ সালে ১ কোটি ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৫ টাকা, ২০২০-২০২১ সালে ৮৪ লাখ ৬০ হাজার ৭৭০ এবং ২০২১ থেকে ২০২২ সালে ১ কোটি ৬১ লাখ ৮২ হাজার ৬৩৯ টাকা। এরমধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি) প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টন সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি ছিল ইলিশ। সেতু চালু হওয়ার পর অবতরণ কেন্দ্রটিতে সামুদ্রিক মাছ রফতানি বেড়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরশেন সূত্রে জানা যায়, দেশের ৩টি উপকূলীয় জেলার ৪টি স্থানে আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প চালু হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় পটুয়াখালীর আলীপুর, মহিপুর, পিরোজপুরের পাড়েরহাট ও লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মৎস্য অবতরণের আধুনিক সুবিধাদি কার্যক্রম স্থাপিত হচ্ছে। এ প্রকল্পের মহিপুরে মাছ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করা হবে। এরমধ্যে বরগুনার ফকিরহাটে মৎস্য উপকেন্দ্র চালু হয়েছে।

পাথরঘাটা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, মৎস্যখাতে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প চলমান। সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদের পাড়ে পদ্মা স্লুইজ ঘাটে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যান্ডিং সাইড স্থাপনের জন্য সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

পাথরঘাটা মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর জোমাদ্দার বলেন, আমরা মাছ কিনে বিক্রির জন্য দেশে বিভিন্ন বাজারে পাঠাই। পদ্মাসেতু চালুর হওয়ায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে এই বন্দরে।

পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য ঘাট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক আকন বলেন, মাছ নিয়ে এখন ফেরিঘাটে যানজটে পরতে হয় না। রাজধানীবাসীকে আর বরফ দেওয়া মাছ খেতে হচ্ছে না।

পাথরঘাটা মৎস্য পাইকার সমিতির সভাপতি মো. সাফায়েত মুন্সি বলেন, ভরা মৌসুমে পাথরঘাটা মৎস্য বন্দর থেকে প্রতিদিন কয়েকশ ট্রাক মাছ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। কিন্তু সড়ক পথ খুব খারাপ হওয়াতে অনেক সময় গন্তব্যে যেতে দেড়ি হওয়াতে মাছ নষ্ট হতো। এখন সেতু হওয়ায় দ্রুত যেতে পারছেন পাইকাররা।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের এই বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছের ব্যবসায় সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। মাছ কিনে ব্যবসায়ীরা সকাল-বিকেল গাড়ি যেতে পারছে। এতে প্রতিদিনের মাছ প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় এখান ফেরি পার হতে হয় না। কম সময়েই দেশের যে কোনো জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার জেলে ও শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছে এই সেতু।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি সুলতানা নাদিরা বলেন, পুরো দক্ষিণাঞ্চলই তো একটা পর্যটনকেন্দ্র। এখানকার খাল-নদী-জঙ্গল আর সাগর পারের বিস্তীর্ণ উপকূল ঘিরে কেবল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। পৃথিবীতে এমন দেশও রয়েছে যারা কেবল পর্যটন শিল্পের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। পদ্মাসেতুর কারণে বরগুনার পর্যটন ও মৎস্য সেক্টরেও ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে।

বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন বলেন, কেবল পর্যটন খাত নয়, পদ্মাসেতু দক্ষিণের জীবনমানে উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এরইমধ্যে এক্সকুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করার ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের কাজ অনেকদূর এগিয়ে এনেছি। পদ্মাসেতুকে ঘিরেই মূলত এই কর্মযজ্ঞ। ফলে এসব উপকূলীয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটছে। সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নতুন নতুন পর্যটনকেন্দ্রগুলো।