সুপ্রভাত থেকে ভিক্টর, নাম বদলেও থামছে না সড়কে মানুষ চাপা


Barisal Crime Trace -GF প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২৩, ২০২৩, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ /
সুপ্রভাত থেকে ভিক্টর, নাম বদলেও থামছে না সড়কে মানুষ চাপা

বিশেষ প্রতিবেদক : নাদিয়া সুলতানার (২০) স্বপ্ন ছিল ফার্মাসিস্ট হবেন। স্বপ্নপূরণের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন। ক্লাস করতে এক সপ্তাহ আগে নারায়ণগঞ্জের বাসা ছেড়ে উত্তরার একটি মেসে ওঠেন। তবে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তার সেই স্বপ্নযাত্রার করুণ সমাপ্তি হলো।

রোববার (২২ জানুয়ারি) ক্লাস না থাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে তার মোটরসাইকেলে বই কিনতে উত্তরার বাসা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যাচ্ছিলেন নাদিয়া। দুপুর পৌনে ১টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় তাদের মোটরসাইকেলটি একটি বাস ধাক্কা দেয়। এতে রাস্তায় ছিটকে পড়েন তারা। এরপর বাসটি নাদিয়াকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এসময় নাদিয়ার বন্ধুও গুরুতর আহত হন।

 

jagonews24

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে বাসটি তাদের ধাক্কা দিয়েছে সেটি একসময় ছিল সুপ্রভাত পরিবহনের। নাম বদলে হয়েছে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন। সুপ্রভাতের মতো ভিক্টর পরিবহনও এর আগে সড়কে চাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়েছে। নাম বদলেও এই বাসটির থামছে না সড়কে দুর্ঘটনা।

 

বাসটির নাম বদলের পেছনেও রয়েছে সড়কে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সামনের সড়কে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। এরপর ৮ দফা দাবি আদায়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের সড়কে আন্দোলন। ঘটনার পর সুপ্রভাত বাসটির রুট পারমিট বাতিল করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। কিন্তু বিআরটিএর এ ঘোষণার আগেই অবস্থা বেগতিক দেখে বদলে ফেলা হয় সুপ্রভাত পরিবহন নামটি, বদলে ফেলা হয় বাসের রংও।

 

 

এরপর ভিক্টর ক্লাসিক, আকাশ, সম্রাট ট্রান্সলাইন নাম ধারণ করে একই রুটে দিব্যি চলাচল শুরু হয় প্রাণঘাতী সুপ্রভাতের বাস। গায়ের রং আর নাম পাল্টালেও পাল্টায়নি সড়কে মানুষ চাপা দেওয়ার ঘটনা। সবশেষ গতকাল রোববার (২২ জানুয়ারি) ভিক্টর নামধারী সেই সুপ্রভাতেরই একটি বাসচাপায় নিহত হন নর্দান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নাদিয়া (২০)।

 

 

জানা যায়, সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নামে বিআরটিএর রুট পারমিট ইস্যু ছিল ১৮৭টি বাসের। কিন্তু বাসপ্রতি এককালীন এক লাখ টাকা ও দৈনিক হারে চাঁদা আদায়ের সুবিধায় ওই রুটে চলছিল তিনশো বাস-মিনিবাস। অতিরিক্ত বাসের ভিড়ে কোম্পানি ও পরিবহন নেতাদের চাঁদাবাজির অর্থ মেটানোসহ দৈনিক হারে চুক্তিভিত্তিক খরচ মেটাতে প্রতি ট্রিপেই ওভারটেকিংয়ের বেপরোয়া রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়েন সুপ্রভাতের চালকরা।

 

 

২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সড়কে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর রাতারাতি নাম বদল করে সেই একই রুটে ভিক্টর ক্লাসিক বাস নামায় আগেরকার সুপ্রভাত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। ঠিক আগের মতোই চাঁদাবাজি ও জুলুম চালক-কন্ট্রাক্টরদের ওপর চাপিয়ে দেন বাস মালিকরা। এতে রাস্তায় নেমে সেই আগের মতোই বেপরোয়া অবস্থানে থাকেন চালকরা।

 

 

গতকাল রোববারের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা ঘাতক বাসটি আটক করতে সক্ষম হলেও পালিয়ে যান ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের চালক মো. লিটন (৩৮) ও হেলপার মো. আবুল খায়ের (২২)। এরপর তাদের গ্রেফতার করে ভাটারা থানা পুলিশ।

 

 

 

জানা গেছে, লিটন ও আবুল খায়ের একই জেলার বাসিন্দা। দুজনই রাজধানীর বাড্ডার আনন্দনগর সার্জেন্ট টাওয়ারের পেছনে ভাড়া বাসায় থাকতেন।

 

 

মেয়ের মৃত্যুর খবরে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে ছুটে আসেন মা-বাবা। তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায়। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় নাদিয়া। বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন একটি পোশাক কারখানায় সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদে চাকরি করেন।

 

 

 

নাদিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মেয়ের স্বপ্ন ছিল বড় ফার্মাসিস্ট হবে। আমার সব শেষ! ওরা আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল! আমি পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলাম।

 

 

কথা বলতে বলতে চেয়ার থেকে পড়ে যান জাহাঙ্গীর হোসেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো! পরক্ষণেই মেয়ের মরদেহ দেখতে মর্গের দিকে ছুটতে থাকেন তিনি। এসময় পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে নিবৃত্ত করেন।

 

 

 

বাসচালক ও হেলপারকে গ্রেফতারের বিষয়ে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আ. আহাদ বলেন, ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি বুঝে বাস ফেলে পালিয়ে যায় চালক-হেলপার। আশ্রয় নেন বাড্ডায়। সেখান থেকে আজ সকালে তাদের গ্রেফতার করা হয়। আজ রাতেই আত্মগোপনের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে ভোলা যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

 

 

সোমবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে বনানীর ডিসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের গুলশান জোনের ডিসি মো. আ. আহাদ বলেন, গতকাল রোববার দুপুর আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের মেধাবী শিক্ষার্থী নাদিয়া মোটরসাইকেলযোগে উত্তরা থেকে আসছিলেন। এসময় মোটরসাইকেল (ঢাকা-মেট্রো-ল-৬০-২৬৮২) চালাচ্ছিলেন তার বন্ধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র মেহেদী হাসান।

 

 

ভাটারা থানাধীন প্রগতি সরণি যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ভিক্টর পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাস (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৫-৩১৯০) মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিলে দুজনেই ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান। এসময় ঘাতক বাসের চাপায় নাদিয়া পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

 

 

jagonews24

 

 

খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতক বাসটি জব্দ ও ভিকটিমকে উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদনের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় ভাটারা থানা পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

 

নিহত নাদিয়া পটুয়াখালীর গলাচিপা পূর্ব নেটা এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেনের মেয়ে। রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন।

 

 

ডিসি আহাদ আরও বলেন, নাদিয়ার মৃত্যুর পর ভাটারা থানায় বাদী হয়ে নিরাপদ সড়ক আইনে মামলা (মামলা নং-৪৬) করেন তার বাবা জাহাঙ্গীর। অন্যদিকে নাদিয়ার সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাসটির চালক ও হেলপারকে গ্রেফতারে আলটিমেটাম দেয়। এরপর তাদের গ্রেফতারে ভাটারা থানার ওসির নেতৃত্বে একাধিক টিম অভিযান শুরু করে।

 

গুলশান জোনের ডিসি বলেন, আমরা রাতেই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ঘাতক বাসকে শনাক্ত ও অভিযুক্ত বাসচালক ও হেলপারকে শনাক্ত করি। এরপর সোমবার সকালে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

 

রাজধানীতে বিভিন্ন সময় সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় বাসকেই ঘাতক হিসেবে বেশি দেখা যায়। ভিক্টর পরিবহনের বাসচাপায় এর আগেও শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতার কারণে বাসে বাসে রেষারেষি বন্ধ হয়েছিল। সড়কে আবারও রেষারেষি শুরু হয়েছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ। এতে শিক্ষার্থীসহ ঝরছে সাধারণ মানুষের প্রাণ।

 

এ ব্যাপারে গুলশানের ডিসি আ. আহাদ বলেন, গুলশান ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগসহ ডিএমপি সড়ক পরিবহন আইন মানার জন্য সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে। আমরা যারা সাধারণ যাত্রী, পথচারী, সড়কে চলাচল করবো, তাদেরও আইন ও নিয়ম-কানুন মানতে হবে, জানতে হবে। তদন্তে অবশ্যই দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা আশ্বস্ত করেছিলাম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের ধরবো, আমরা সেটা করতে সক্ষম হয়েছি।

 

 

সুপ্রভাতের নাম বদলে ভিক্টর হওয়া এবং সড়কে মানুষ চাপা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। গ্রেফতার আসামিদের সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। রিমান্ডে পেলে জিজ্ঞাসাবাদে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।