ভোলার মুঘল আমলের মসজিদটি দৃশ্যমান হলো


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ২৪, ২০২৩, ৬:০৭ অপরাহ্ণ /
ভোলার মুঘল আমলের মসজিদটি দৃশ্যমান হলো

ভোলা প্রতিনিধি : ভোলা সদর উপজেলায় মুঘল আমলের ৫০০ বছর পুরনো মসজিদটি দৃশ্যমান হয়েছে। উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের স্থানীয় মাঝি বাড়ির সুপারী বাগানে এ মসজিদের অবস্থান। প্রাচীন এ মসজিদ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে কৌতূহল ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শত বছর ধরে মসজিদটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় চারদিকে বন-জঙ্গলে ঢেকে যায়। এর পর থেকে কেউ ভয়ে মসজিদটির কাছেও যেতেন না। সম্প্রতি বাগানের বন-জঙ্গল পরিষ্কার করা হলে মসজিদটি জনসম্মুখে আসে। গত কয়েক মাস আগে ওই মসজিদের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সকলের নজর কাড়ে। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন মসজিদটি পরিদর্শন করে। বর্তমানে মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মসজিদটি চুন-সুরকির গাঁথুনিতে বর্গাকার ভূমির ওপর নির্মিত। মসজিদের ছাদ আর্ধগোলাকার একটি গম্বুজে আচ্ছ্বাদিত। মসজিদটি দৈর্ঘ্যে সাড়ে ২৪ ফুট এবং প্রস্থে সাড়ে ১৯ ফুট। এর দেয়ালের পুরুত্ব আড়াই ফুট। মসজিদের সামনের দেয়ালে মুঘল স্থাপত্য রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য আয়তাকার প্যানেলিং ফ্রেম এবং আবদ্ধ খিলান নকশায় সজ্জিত। ভোলা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মসজিদটি দেখতে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন।

স্থানীয় প্রবীণ লোকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মসজিদটি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের শাসনামলে (১৬০৫-১৬২৯) নির্মিত হওয়ার ধারণা পাওয়া যায়। মুঘল আমলে ভোলা ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অধীনে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে মুঘল সুবেদার ছবি খাঁকে চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলের ফৌজদার নিয়োগ করা হয়। তিনি ছিলেন পূর্তকাজে দক্ষ এক ব্যক্তি। ছবি খাঁ এ অঞ্চলে অনেক সড়ক নির্মাণ করেন। তিনি জনগণের দৈহিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার বিবেচনায় অনেক মসজিদ ও দিঘি খনন করেন। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে দক্ষিণ শাহবাজপুর বা ভোলার প্রাচীন অঞ্চলের অধিকাংশ ভূখণ্ড বিলীন হয়ে যাওয়ায় ছবি খাঁর স্থাপত্যকর্মের সকল চিহ্ন মুছে যায়। সম্ভবত কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে বর্তমানে আবিষ্কৃত এই মসজিদটি। এটি হতে পারে ছবি খাঁর তৈরি স্থাপত্যকর্মের একটি নিদর্শন।

স্থানীয় মাঝি বাড়ির বাসিন্দা স্বপন মহরী (৫৫) জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই তাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বাগানে এ মসজিদটি দেখে আসছেন। তারা বাবা ও দাদার কাছ থেকেও মসজিদটির এই আস্থার কথা শুনেছেন। তারাওস মসজিদটি এই অবস্থায় দেখেছেন। তবে সে সময় মসজিদটির চারদিক বন-জঙ্গলে আবৃত ছিল। দিনের বেলায়ও কেউ ভয়ে সেখানে যেতেন না।

তবে ২০০০ সালের দিকে বাগানের বন-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হলে মসজিদটি স্থানীয়দের নজরে আসে। পরে সেখানে জৈনপুরী পীর সাহেবকে এনে মাহফিলও করা হয়। তখন মসজিদটি পরিচালনার জন্য একটি কমিটিও করা হয়। কিন্তু কমিটির সদস্যদের মধ্যে অনেকে মারা গেলে পার্শ্ববর্তী মসজিদের লোকজনের অসহযোগিতার কারণে মসজিদটি আবারো পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সর্বশেষ গত করোনাকালীন দুই বছর আবার মসজিদটি পরিষ্কার করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ রমজানে তারাবির নামাজও আদায় করা হয়। কিন্তু পরে বাড়ির লোকজন যার যার কর্মস্থলে চলে যাওয়ায় পুনরায় নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি আরো জানান, মসজিদটির আশপাশের জমি ব্যক্তি মালিকানা হলেও মসজিদসহ তিন শতাংশ জমি সরকারি খাস। জমির কাগজপত্র দেখা যায়, এক সময় এ সকল জমি নিগাবাদ নামের এক ব্যক্তির ছিল। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক মাস আগে এক ব্যক্তি মসজিদটির একটি ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়ার পর এটি নিয়ে জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেক লোক মসজিদটি দেখতে আসেন। এমনকি ভোলার পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকও আসেন মসজিদটি দেখতে। পরে তারা এটি সংরক্ষণের আশ্বাস দেন। এ ছাড়াও খুলনার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের লোকজনও এখানে এসে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে গেছেন। মসজিদটির স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এটি ৫০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরনো মসজিদ।

মসজিদটি দেখতে আসা স্থানীয় কলেজশিক্ষক মো. রাশেদ আলম জানান, তিনি ২০০৪ সালে তার এক শিক্ষকের সাথে এই মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু সে সময় মসজিদটি বন-জঙ্গলে আবৃত থাকায় এটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না। সম্প্রতি মসজিদটি নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলে তিনি পুনরায় মসজিদটি দেখতে যান। প্রতিদিন শত শত মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন বলেও জানান তিনি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা ও বরিশাল বিভাগীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. গোলাম ফেরদৌস জানান, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভোলা জেলার উপশহর এলাকার বাংলা বাজার এলাকায় প্রাচীন মসজিদটির ঘটনা জানতে পারেন। এই প্রত্নানুসন্ধান কার্যক্রমটি বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। কেননা দ্বীপ জেলা ভোলায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত কোনো পুরাকীর্তি নেই। এমনকি এ জেলায় অতীতে পুরাকীর্তির সন্ধান না পাওয়ায় এখানে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বা অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি।

তাই চলতি মাসের ৫ তারিখে তার নেতৃত্বে খুলনা থেকে চার সদস্যের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় এ পুরাকীর্তি সংরক্ষণের যোগ্যতা যাচাই, আলোকচিত্র ধারণ, ডকুমেন্টেশন, পুরাকীর্তি সংরক্ষণ সম্পর্কে স্থানীয় জনসাধারণের মতামত সংগ্রহ করেন। তাদের কাছে এ মসজিদটির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সংরক্ষণ উপযোগিতা থাকায় মসজিদটি সংরক্ষণের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। অধিদপ্তর থেকে গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো জানান, আবিষ্কৃত নিদর্শনটির প্রত্নবৈশিষ্ট্য নিরুপণ ও ঐতিহাসিক সূত্র অনুসন্ধান করে তাদের প্রাথমিক ধারণা, এই মসজিদটি মুঘল আমলের কোনো এক সময়ে নির্মিত হতে পারে। ১৭ শতকের শেষে বা ১৮ শতকের শুরুতে এটি নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ধারণা করা হয়, পরবর্তী মুঘল আমলে বিশেষ করে নবাব মুরশিদ কুলী খানের আমলে রাজস্বনীতিতে সংস্কারকৃত এই দ্বীপ ভূমিতে মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠা এবং ইসলাম প্রচারের কারণে এই প্রাচীন মসজিদ গড়ে ওঠে। আবিষ্কৃত মসজিদটির কারণে এ জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। এ সকল পুরাকীর্তি পর্যটন উন্নয়নে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে।