বরিশালের তৈরী হাত পাখা দেশব্যাপি মানুষের শিতল করছে শরীর, ভাল নেই পাখা কারিগররা

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত এপ্রিল ১২ সোমবার, ২০২১, ০১:৩৬ অপরাহ্ণ
বরিশালের তৈরী হাত পাখা দেশব্যাপি মানুষের শিতল করছে শরীর, ভাল নেই পাখা কারিগররা

শামীম আহমেদ, ॥ এবারো করোনার দ্বীতিয় ঢেউ শুরু হওয়ার কারনে বাংলা ও বাঙালীর প্রাণের আনন্দের উৎসব বাংলা নববর্ষে শোনা যাবে না ঢাকেরতালের আওয়াজ। চোখে দেখা যাবে না বৈশাখী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া দর্শনার্থীরা হাতে হাতে তালের পাখা নেড়ে গাইবে না এসো হে বৈশাখ। এই বৈশাখকে ঘিড়ে প্রায় ছয় মাস ধরে তালের পাখার কাজ করে যা বিক্রি করার মাধ্যমে কিছুটা সংসারের আর্থিক ক্ষতিপুরন পুষিয়ে নেবে সেই সকল পাখা কাররিগরদের স্বপ্ন এই মহামারী করোনায় তাদের সেই স্বপ্ন ম্লান করে দিয়েছে।

 

এবার পাখা তৈরীর কারিগররা লাভের চেয়ে লোকসান ও আর্খিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন বেশি বলে তারা মনে করেন। বরিশাল জেলার সব কয়টি উপজেলায় বসবে না মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা। সব সময় এ মেলাকে ঘিড়ে একটু বেশি অর্থের আশায় তৈরী হয়ে থাকে রং বে রং-এর বিভিন্ন ধরনের তালপাতার হাত পাখা। শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ এর ভেলকিবাজী, ভ্যপসা গরম ও প্রচন্ড তাপদাহের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী চিরচেনা তালপাখা। তাই এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বরিশালের পাখা পল্লীর মহিলা-পুরুষ কারিগরা।

 

বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার চাঁদশী গ্রামের পাখা পল্লীর কারিগররা বলেন, এ ‘পাখা পল্লীর’ তালপাখা বেশি বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন মেলা, হাট-বাজার, বাসষ্ঠ্যান্ডসহ বিভিন্ন দোকানে।

 

গরম এলেই প্রচন্ড তাপদাহ থেকে একটু স্বত্তি পেতে সকলের হাতেই চোখে পড়ে যায় তালপাতার হাত পাখা। আর এসব পাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক পরিবার। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে ওইসব পরিবারের সদস্যরা তালপাতা দিয়ে হাত পাখা তৈরি করে জীবন জিবিকা ও সংসারের ভরন-পোষন চালিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে।

 

পাখা পল্লীর কারিগররা আরো বলেন, পাখা তৈরীর উপকরণের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় অর্থাভাবে এখানকার অনেকেই বর্তমান সময়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। যারা এখনো এ ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার সহায়তা কামনা করছেন। সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে হস্ত শিল্পটিতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সবস্তরের এখন দাবি উঠেছে। গৌরনদী উপজেলার গ্রামটির নাম চাঁদশী হলেও পাখা তৈরির এলাকাটিকে ‘পাখা পল্লী’ নামেই সকলের কাছে অতি সুপরিচিত।

 

এ ব্যাপারে আলাপকালে পাখা পল্লীর কারিগর হাসেম খলিফা (৬০), তরু হালদার (৪০) বলেন, বিগত ৩০ বছর ধরে তারা পাখা বানানোর কাজ করছেন। তাদের পরিবারের সকল সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে এ পেশায় বর্তমান সময়ে কোন রকম টিকে আছেন। বর্তমানে পাখা তৈরির প্রধান উপকরণ ‘তাল পাতার’ তীব্র সংকট চলছে। গৌরনদী উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে অধিক মূল্যে তাদের তালপাতা ও বাঁশ ক্রয় করতে হয়। বছরের ছয় মাস তারা এ কাজ করে থাকেন।

 

হাসেমের পরিবারের ৭ জন ও তরুন হালদারের পরিবারে ৬ জন সদস্য এ কাজের সাথে জড়িত রয়েছেন। হাসেমের কন্যা সিমু আক্তার নবম ও কাজল দশম শ্রেনীতে পড়া-শুনা করছেন। স্কুল থেকে ফিরেই বাবার সাথে এ পাখা বানানোর কাজ করেন তারা। রোগাক্রান্ত হাসেমের সাত সদস্যর সংসার চলছে হাত পাখা বানিয়েই। তার পরিবারের সকলে মিলে একদিন ১’শ টি হাতপাখা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি পাখা তৈরি করতে তাদের খরচ হয় ১২ টাকা আর পাইকারি হিসেবে বিক্রি করছেন ১৫ টাকায়।

 

এদিকে পাশ^বর্তী উপজেলা আগৈলঝাড়া উপজেলার কারিগর কাসেম খলিফা, আবুল হোসেন, শাহজাহান খলিফা, স্বপন খলিফাসহ একাধিক করিগর জানান, সপ্তাহে একদিন পাইকার আসে বাড়ি থেকে হাত পাখা ক্রয় করে নিয়ে যায়। পাখা তৈরি করাই হচ্ছে তাদের গ্রামর প্রধান আয়ের উৎস। তাদের হাত পাখা পল্লীর তৈরি পাখা বিক্রি হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মেলা, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

 

তারা আরো জানান, উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির পর অর্থাভাবে এ পেশার সাথে জড়িত আরো প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার পেশা পরিবর্তন করেছেন। বাকি পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে সহজ শর্তে সরকারী ভাবে সুদ মুক্ত ঋণ দেয়ার জন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ ব্যাপারে বরিশালে সদ্য যোগদানকারী জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, আমি এ জেলায় নতুন এসেছি খুব বেশি দিন হয়নি। তবে আমি পাখা পল্লীর খবর পেয়েছি। পরিদর্শনের জন্য খুব শ্রীঘই যাব আশা করছি। । কারিগররা নগদ অর্থ সহায়তাসহ ব্যাংক ঋণে’র জন্য আবেদন করলে বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসক সব ধরনের সহযোগিতা করবে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃbarishalcrimetrace@gmail.com