সম্রাট আকবর ও তাঁর রাজজ্যোতিষী শিরাজী বাংলা সনের প্রবর্তক


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৪, ২০২৩, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ /
সম্রাট আকবর ও তাঁর রাজজ্যোতিষী শিরাজী বাংলা সনের প্রবর্তক
সোহেল সানি  :  ভারত সম্রাট মহাবীর আকবর তাঁর রাজত্বের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে  বাংলা সন চালু করেন। ফলে বাংলায় শকাব্দ, লক্ষনাব্দ,পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি সনের প্রচলন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। শুরু হয় বাংলা বা বঙ্গাব্দের প্রচলন। এই সন প্রচলনের ইতিহাসে সংযোগ ঘটেছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ। সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসেছিলেন ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল। ইংরেজি সনের হিসেবে তাঁর সিংহাসনে বসার প্রকৃত দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলায় আদি ঋতু বৈচিত্র্য অনুসারে বাংলা সন চালু করা হয়। রাজা বা সম্রাটের রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যেসব পঞ্জিকার বছর গণনা শুরু করা হয়, সেসব বছরের যেদিনই রাজা বা সম্রাটের অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে বছর শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়। সম্রাট আকবরের সিংহাসন বসার ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের স্মৃতিবহ দিন  ইংরেজী সন থেকে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১১ দিন কম। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ দিলেই ইংরেজি সন মিলতে পারে।
বাংলা সন বাংলার নিজস্ব সন। এর উৎপত্তি ও বিকাশের ইসলামী উত্তরাধিকার সঞ্চাত। ভারত সাম্রাজ্যের সম্রাট মহামতি আকবরের আদেশে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাঁরই বিজ্ঞরাজ জ্যোতিষী আমির ফতেহউল্লাহ শিরাজীর গবেষণার ঐতিহাসিক ফসল হলো বাংলা সন।
বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের জনক নিয়ে মতভেদ দূর করেছেন। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অমর্ত্য সেন ও আরেক বাঙালি বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। এ দুই ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিপটে ভারত সম্রাট মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক।
সামাজিক ক্ষেত্র বিশেষ করে মৌসুমের প্রতি দৃষ্টিপাত করেই রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরী সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌরসনের প্রয়োজনবোধ করে বাংলা সন বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঘটানো হয়।
মানুষ কাল বা সময় বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছিল, সভ্যতার বিকাশের আদি যুগ থেকেই। প্রয়োজনের তাগিদে বছর, মাস, সপ্তাহ ও দিন ইত্যাদি গণনার প্রচলন করে। সমগ্র বাংলায় সেই থেকে বাংলা সন চালু রয়েছে। সেই হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ছাড়াও স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ভারতের অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় বাংলা সন অর্থাৎ বাংলা বর্ষপঞ্জী ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ রাজত্বের আগে সমগ্র ভারতবর্ষে হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলা সন চালুর ফলে বাংলায় শকাব্দ, লক্ষনাব্দ,পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি সনের প্রচলন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাংলা বা বঙ্গাব্দের প্রচলনের ইতিহাসে সংযোগ ঘটেছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ।
বাংলা সন বাংলার ঐতিহ্য পরস্পরায় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এলে পহেলা বৈশাখে বাঙালিরা আনন্দঘন উল্লাসে বিমোহিত হয়ে পড়ে। অবশ্য ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বে ভারত ভেঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশের পর বাংলা ভাষার ওপর যেমন আঘাত আসে তেমনি বাংলা সনের ওপর চরম আঘাত আসে। জেনারেল আইউব খান ক্ষমতায় বসে পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে অর্থাৎ রবীন্দ্র সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করে এবং পহেলা বৈশাখের ওপর রচিত তাঁর সঙ্গীত “এসো হে বৈশাখ এসো এসো…” বাঙালির মুখ থেকে কেড়ে নেয়ার হীন চেষ্টা লক্ষ করা যায়। ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পূর্বপাকিস্তান বাংলাদেশরূপে স্বাধীন হলে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ শেখ মুজিবুর রহমান রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা সঙ্গীটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণই কেবল নয় পহেলা বৈশাখকে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন ঘোষণা করেন। সেই থেকে পালিত হয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। বাংলা সনকে  সারাবছরই যেন ধরে রাখার মধ্যে
আমাদের বাঙালির স্বকীয়তার তাৎপর্য নিহীত রয়েছে।
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে  বাংলা পঞ্জিকার প্রশ্নে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেতৃত্বাধীন কমিটির রেখে যাওয়া সুপারিশ গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকার কর্তৃক গৃহীত সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা বাতিল হয়ে যায়। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সুপারিশ অনুযায়ী ১৪ এপ্রিলকে বছর শুরুর দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে এবং  খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে চৈত্র মাসে একদিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বঙ্গাব্দ, বাংলা সন বাংলা বর্ষপঞ্জী হলো বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জী। ঋতু বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলা পঞ্জিকা বাঙালির জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ও বটে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিনের গণনা শুরু। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা লাগে। এই সময়টাই সৌরবছর। গ্রেগরীয় সনের মতো বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আকাশের রাশিমন্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়। যেমন যেসময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।
বঙ্গাব্দ শুরু হয় পহেলা বৈশাখ দিয়ে। বঙ্গাব্দ সবসময়েই গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর অপেক্ষা ৫৯৩ বছর কম।
উল্লেখ্য ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গজয়ের পর মুসলমান শাসনামলে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষনাব্দ সনের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরী সনের প্রচলন শুরু হয়।
সন শব্দটি আরবী শব্দ হতে উদ্ভূত, অর্থবর্ষ। আর সাল কথাটা ফার্সি শব্দ হতে উদ্ভূত। ভারত সম্রাট আকবরের পাশাপাশি রাজা শশাঙ্ক, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর নামও কোন কোন লেখক উল্লেখ করলেও তাদের মনগড়া যুক্তিতর্ক প্রত্যাখ্যান করেন অমর্ত্য সেন ও মেঘনাদ সাহা। যদিও ঐতিহাসিকদের যুক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তনকারী। এদেশে সবাই হিজরী সনই ব্যবহার করতো। ফলে ফসল কাটার খুব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো, কারণ আগের বছর যে তারিখে ফসল কাটতো, পরের বছর সে তারিখ ১১ দিন এগিয়ে যেত।
আকবর যে হিজরী সন ছিল তখন থেকেই এক সৌরসংবত প্রবর্তন করেন। এটিই হচ্ছে বঙ্গাব্দ। সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (হিজরী ৯৬৩) এবং ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এই থেকে ঐতিহাসিকরা একমত হন যে, হিজরী থেকেই বঙ্গাব্দ চালু করা হয়। ৫২২ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ হিজরী সনের শুরু হযরত মোহাম্মদ নবী করিম (সঃ) এর সময় হতে হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ) খিলাফতকালে হিজরী সনের সৃষ্টি। এই সনের শুরু ১৬ জুলাই ৬২২অব্দ ধরা হলেও আসলে হিজরতের তারিখ রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার। ২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ অব্দ ধরা হলে আরব দেশের নিয়মানুযায়ী বছরের প্রথম মাস পহেলা মহরমের তারিখ হতে বছর ধরা হয়েছে। হিজরী সন ছিল চন্দ্রমাস। ওই মাসই হিজরী সন ও তারিখের হেরফের হতো, অর্থাৎ সৌর বছরের হিসাবের দিন তারিখ মাসের গরমিল হতো প্রচুর। সে কারণেই ৯৬৩ হিজরী = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু করা হয়। এভাবে ৯৬০= হিজরী = ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ এর ১১ এপ্রিল, সম্রাট মহামতি আকবরের সিংহাসন আরোহণের ও পহেলা বৈশাখ, ৯৬০ বাংলা সন। এসব একদিকে নবী করিম (সঃ) এর হিজরতের (৬২২ খ্রিষ্টাব্দ)। বাংলা সনের শুরু ৬২২ খ্রিস্টাব্দে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ।