‘ইলিশ আমাগো জন্য না, বড়লোকের খাওন’


Barisal Crime Trace -FF প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৩, ১২:২১ অপরাহ্ণ /
‘ইলিশ আমাগো জন্য না, বড়লোকের খাওন’

ভোলা প্রতিনিধি : স্কুলশিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন। ভোলা শহরের কাছাকাছি একটি মাধ্যমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। সোমবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে তিনি ভোলা শহরের কিচেন মার্কেটের অবস্থিত মাছ বাজারে মাছ কিনতে আসেন। কিচেন মার্কেটের গেটের কাছেই ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশসহ আরো বেশ কিছু জাটকা নিয়ে বসে আছেন মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল।

মোজাম্মেল হাসেনকে দেখেই মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল ডাক দিলেন ‘স্যার এদিকে আইয়েন। বড় মাছ কডা লইয়া যান, দাম কমায়া রাখমু’। মাছ ব্যবসায়ীর বার বার অনুরোধের পর স্কুলশিক্ষক মোজাম্মেল হোসেন মাছের দাম জিজ্ঞাসা করলে মাছ ব্যবসায়ী বলেন, স্যার দাম তো অনেক, আপনার জন্য ছয় হাজার টাকা। এ কথা শুনেই তিনি সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলে মাছ ব্যবসায়ী ডেকে বলেন, স্যার, আপনি এক হাজার টাকা কম দেন। স্কুলশিক্ষক কেবল বললেন, ‘ইলিশ মাছ আমাগো জন্য না, ইলিশ এখন বড়লোকের খাওন।’

মোজাম্মেল হোসেনের মতো এরকম অনেকেই ইলিশ খাওয়ার স্বাদ থাকলেও সাধ্য না থাকায় কিনতে পারছেন না। কারণ গত এক সপ্তাহ ধরে ভোলার নদী ও সাগরে ইলিশ মাছের সরবারহ কিছুটা বাড়লেও দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতরা বাইরে।

ভোলার বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে ঘাটগুলোতে মাছের সরবারহ কিছুটা বেড়েছে। এতে নদীতে মাছ শিকার করে খরচ গিয়েও কিছুটা লাভের মুখ দেখছেন জেলেরা।

ভোলার তুলাতুলি মাছঘাটের জেলে মো. মহিউদ্দিন মাঝি জানান, তিনি গত রাতে মেঘনা মাছ শিকারে গিয়ে বড় সাইজের দুটি ইলিশ ও পাঁচ হালির মতো জাটকা পেয়েছেন। বড় দুটি মাছ ২৫০০ টাকা ও জাটকা সাড়ে ৫০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। এতে খরচ গিয়েও তার দুই হাজার টাকা লাভ হয়েছে।

সাগর মোহনায় মাছ শিকার করা চরফ্যাশনের ঢালচর মাছ ঘাটের জেলে হাসান মাঝি জানান, তিনি গতকাল দু’বারে সাগর মোহনায় মাছ শিকার করে ১৬ হাজার টাকার ইলিশ মাছ বিক্রি করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে সাত হাজার টাকার মতো।

একই ঘাটের সাইফুল মাঝি জানান, তিনি সাতজন জেলে নিয়ে সাগর মোহনায় মাছ শিকারে গিয়ে দুইবারে ২২ হাজার টাকার ইলিশ পেয়েছেন। গত দুই দিন সাগর মোহনায় ইলিশের পরিমাণ বেড়েছে। এভাবে আগামী এক মাস মাছ ধরা পড়লে জেলেরা তাদের ধার-দেনা দিয়ে লাভের মুখ দেখবেন।

তুলাতুলি মাছ ঘাটের আড়ত্দার মো. ইউনুছ জানান, গত জুলাই ও আগস্ট- দুই মাস মাছের ভরা মৌসুম থাকলেও ইলিশের তেমন কোনো দেখা মেলেনি। গত এক সপ্তাহ ধরে মাছ কিছুটা বেড়েছে। দামও ভালো। ঘাটে এক কেজি ওজনের ইলিশের হালি ডাকে (নিলামে) বিক্রি হচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা। আর জাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৪০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায়।

ঢালচর মাছ ঘাটের আড়ৎদার মো. রাসেল পাটওয়ারী জানান, জুলাই মাসের শেষের দিকে সাগরে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে অনেকটা হতাশ হয়েই ঘাটে ফিরতেন জেলেরা। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে সাগরে ইলিশের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। গত দুই দিনে তার আড়তের ১০ থেকে ১৫টি ট্রলার গড়ে প্রতিদিন ১৫ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করেছেন। তাদের ঘাটে এক কেজি থেকে তার ওপরের এক হালি ইলিশ বিক্রি হয় চার হাজার ৮০০ টাকা, বড় ইলিশ দুই হাজার ২৫০ টাকা, বেলকা সাইজের ইলিশ এক হাজার ৩০০ টাকা, গোটলা সাইজের ৬৫০ টাকা ও জাটকা ইলিশ ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। তিনি গত দুই দিনে এক লাখ ২০ হাজার টাকার ইলিশ ঢাকার মোকামে পাঠিয়েছেন। এভাবে ইলিশ পড়তে থাকলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

ভোলা জেলার মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ জানান, ভোলার নদী ও সাগরে ইলিশের পরিমাণ বেড়েছে। জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েছে। সামনে ইলিশের পরিমাণে আরো বাড়বে।