উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২২ এমপি-মন্ত্রীর স্বজনের পরাজয়


Barisal Crime Trace -HR প্রকাশের সময় : জুন ৮, ২০২৪, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ /
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২২ এমপি-মন্ত্রীর স্বজনের পরাজয়

অনলাইন ডেস্ক // চার ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২২ জন এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা পরাজিত হয়েছেন। কোনো কোনো এমপি-মন্ত্রী প্রভাব বিস্তার করেও জেতাতে পারেননি তাদের প্রার্থীদের। স্বজনদের পাশাপাশি কেন্দ্র থেকে কাউকে সমর্থন না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও এমপিরা পছন্দের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকেই অনেক প্রার্থীর জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

 

গত চার ধাপের নির্বাচনে প্রায় ৫০ জন এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা ভোটে লড়েন। এর মধ্যে ২২ জনের স্বজনরা পরাজিত হয়েছেন। পরাজিতদের তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই, সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের খালাতো ও মামাতো ভাই, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ছোট ভাই ও তার সমর্থিত প্রার্থী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের চাচাতো ভাই পাভেলুর রহমান, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই ও ভাতিজা, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেকের ফুফাতো ভাই এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামের ভাতিজা, হুইপ সায়মুল সরওয়ার কমলের ভাই, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ সাদিকের ভাগ্নে, বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর শ্যালক, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও শরীয়তপুর-১ আসনের এমপি ইকবাল হোসেন অপুর চাচাতো ভাই, লালমনিরহাট-২ আসনের এমপি সাবেক মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের ভাই, হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মো. আবু জাহিরের সম্বন্ধী, হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়ার ভাই, মৌলভীবাজার-১ আসনের এমপি শাহাব উদ্দিনের ভাগ্নেসহ ২২ জন এমপি-মন্ত্রীর স্বজন হেরেছেন উপজেলা নির্বাচনে।

 

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ার কথা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে এবার দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে মন্ত্রী ও দলীয় এমপির স্বজনদের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা হয়। তবুও তিন ধাপে মন্ত্রী-এমপিদের অর্ধশতাধিক স্বজন ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তাদের অনেকেই স্বজনদের পক্ষে ছিলেন। তবে পক্ষ-বিপক্ষে যে অবস্থানই নেন না কেন, নির্বাচনে স্বজনদের ভরাডুবিতে এসব মন্ত্রী-এমপির ইমেজ ও জনপ্রিয়তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয় পর্যায় থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, প্রথম ধাপে ৮ মে, দ্বিতীয় ধাপে ২১ মে, তৃতীয় ধাপে ২৯ মে এবং ৫ জুন চতুর্থ ধাপে উপজেলায় ভোট গ্রহণ হয়। যদিও ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে স্থগিত হওয়া ২০ উপজেলায় ৯ জুন ভোট গ্রহণ হবে।

 

জানা গেছে, ২৯ মে অনুষ্ঠিত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। এ নির্বাচনে চারজন প্রার্থীর মধ্যে তিনি টেলিফোন প্রতীকে ৪ হাজার ৬১০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এমনকি তার জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

 

এর আগে ২১ মে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য আ হ ম মুস্তফা কামালের ছোট ভাই গোলাম সারওয়ার। টানা তিনবারের উপজেলা চেয়ারম্যান প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম সারওয়ার এবার তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন। ওই উপজেলায় বিজয়ী হয়েছেন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল হাই বাবলু। সারওয়ারের এ পরাজয় পুরো কুমিল্লা জেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বক্তব্য, মন্ত্রীর ভাই হিসেবে সারওয়ার ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। এখানেই শেষ নয়, গত ৫ জুন কুমিল্লার নাঙ্গলকোটেও লোটাস কামাল সমর্থিত প্রার্থী আনারস মার্কার আবু ইউসুফ ভূঁইয়া তৃতীয় হয়েছেন। তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচনে হেরে গেছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডা. জাহিদ মালেকের ফুফাতো ভাই মো. ইসরাফিল হোসেন। এ নির্বাচনে তাকে সমর্থন দেন জাহিদ মালেক। ২০১৯ সালে মো. ইসরাফিল হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তিনি হেরে গেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সুদেব কুমার সাহা। একইভাবে সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ডা. জাহিদ মালেকের পছন্দের প্রার্থী গোলাম হোসেনও হেরে গেছেন। কক্সবাজার-৩ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের বড় ভাই সোহেল সরওয়ার কাজল রামু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেছেন। সুনামগঞ্জের সদরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন সদর আসনের নতুন এমপি মোহাম্মদ সাদিকের ভাগ্নে ফজলে রাব্বী স্মরণ।

 

বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরার চাচাতো ভাসুরের স্ত্রী নুর আফরোজ হ্যাপিও পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ভোট করে হেরে গেছেন। এ নির্বাচনে সুলতানা নাদিরার মেয়েরা নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবিরের পক্ষে কাজ করেন। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর শ্যালক ফিরোজ আহম্মেদ রিজু শিবগঞ্জ উপজেলায় এবং ময়মনসিংহের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে সেলিমা বেগম সালমা ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে পরাজিত হন। মৌলভীবাজার-১ আসনের এমপি ও সাবেক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের ভাগ্নে সোয়েব আহমদ বড়লেখা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন। দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনে লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান আহমেদের ছোট ভাই মাহবুজ্জামান আহমেদ ওই জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়, শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর চাচাতো ভাই বিল্লাল হোসেন দিপু মিয়া শরীয়তপুর সদর উপজেলায়, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু জাহিরের সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) মো. আক্তারুজ্জামান বাহুবল উপজেলায় ও সদর উপজেলায় তার ভাতিজা ওয়াসিম উদ্দিন খান চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেছেন। হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়ার বড় ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাজন চৌধুরী বাহুবল উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে হেরে গেছেন। প্রথম ধাপে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেছেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুুর রাজ্জাকের খালাতো ভাই মো. হারুনার রশীদ ও মামাতো ভাই খন্দকার মনজুরুল ইসলাম (তপন)। এ নির্বাচনে মো. হারুনার রশীদকে সমর্থন দেন ড. আবদুর রাজ্জাক। এ উপজেলায় মো. আবদুল ওয়াদুদ তালুকদার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই মো. আবদুল বাতেন এবং ভাতিজা আবদুল কাদের পাবনার বেড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তারা দুজনই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় নির্বাচনে হেরে গেছেন স্থানীয় এমপি মো. মাজহারুল ইসলামের চাচাতো ভাই আলী আফসার। আর মাদারীপুরে সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের চাচাতো ভাই পাভেলুর রহমান হেরেছেন তার ভাতিজা আসিবুর রহমানের কাছে। শাজাহান খান এ নির্বাচনে তার ছেলে আসিবুর রহমানের পক্ষে ছিলেন।