বরিশাল জেলা পরিষদ দুই আউলিয়ার দখলে, মোজাহিদ-ছরোয়ার কোটিপতি 

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত জুলাই ৩১ শনিবার, ২০২১, ০৬:৩০ অপরাহ্ণ
বরিশাল জেলা পরিষদ দুই আউলিয়ার দখলে, মোজাহিদ-ছরোয়ার কোটিপতি 

শামীম আহমেদ ॥ বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন বরিশাল জেলা পরিষদের কর্মকর্তা- কর্মচারীরা। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নাম ভঙিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন তারা । এখানে টাকা ছাড়া সেবা মেলেনা। টেবিলে টেবিলে টাকা। চেক নিতেও টাকা। টাকা হলে জেলা পরিষদের অনেক অনিয়মও নিয়মে পরিনত হয়। বরিশাল জেলা পরিষদের সকল সম্পত্তি উচ্চমান সহকারী মাওলানা মোজাহিদুল ইসলাম লিজ দিয়ে থাকেন। তিনি বরিশাল শিশু পার্কের পাশ্বের জমি মোটা টাকার বিনিময়ে নিজ এলাকার আত্মীয়- স্বজনদের নামে চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে লিজ নিয়ে নেন। যা জেলা পরিষদের মাসিক মিটিংএ সদস্যরা একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি।

 

 

বিশ্বস্থ সূত্রে জানাগেছে, বরিশাল নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার রুনা বেগম এর মার নামে জমি লিজ বাবদ ১ লক্ষ টাকা আদায় করেন মোজাহিদ। নগরীর আরিফ নামের এক জন কয়েক মাস জেলা পরিষদের বারান্দায় ঘুরেও মড়ক খোলার পুলের জমি লিজ পায়নি তার কাছে হাদিয়া স্বরুপ ৫০ হাজার টাকা দাবী করলে,তিনি টাকা দিতে না পারায় তার পক্ষে জমি লিজ নেয়া সম্ভব হয়নি।

 

জানাগেছে,জেলা পরিষদের সকল মার্কেটর ছাদ অবৈধভাবে পরিষদের কোনো সদস্যদের না জানিয়ে টাকার বিনিময় তা চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে লিজ দিয়েছে মাওলানা মোজাহিদ।তিনি জেলা পরিষদের গরীর মানুষের আর্থিক সাহায্যের টাকাও মেরে খায় বলে অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে নামে বেনামে টাকা উত্তোলন করেন তিনি। এ সকল অপকর্মের জন্য তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মানিকহার রহমান এর সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২০ সালের ২২ জুলাই বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে তাকে পিরোজপুরে বদলী করা হলেও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে তিনি পুনরায় বদলী বাতিল করে স্বপদে বহাল থেকে পুনরায় তার পুরানো পেশায় ফিরে যান।এছাড়াও মুজাহিদ ২০০২ সাল ও ছরোয়ার ২০০৬ সাল থেকে বরিশাল জেলা পরিষদে থেকে টাকার পাহাড় বানিয়েছেন।কখনো কোন নির্বাহী আদেশ তাদের বদলি করতে পারেনি।

 

সূত্রে আরও জানাগেছে,বরিশাল জেলা পরিষদের অধীনে ১৭টি মার্কেট ৩৭৯ টি স্টল, ৪৪৩টি প্লট, ১৯টি খেয়াঘাট, ৫০টি পুকুর রয়েছে। এর দায়িত্বেও রয়েছেন উচ্চমান সহকারী মাওলানা মোজাদিুল ইসলাম ও উচ্চমান সহকারী মোঃ ছরোয়ার হোসেন।
প্রতিটি স্টল এর নাম পরিবর্তনের জন্য কয়েক লক্ষ টাকা দিতে হয় তাদের। তারা বলে চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিতে হবে বলে নাম পরিবর্তন করে একজনের স্টল অন্য জনের নামে দিয়ে দেয়।

 

 

স্টল ভাড়া ব্যাংকে দেয়ার নিময় থাকলেও মোজাহিদ-ছরোয়ার নিজেরা দিয়ে দিব বলে টাকা রেখে নিজেদের পকেট ভারি করেন। যার কারণে জেলা পরিষদের মার্কেট ভাড়া বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে। এই দুই অসাধু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার স্বজনদের নামে বেনামেও অনেক স্টল আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সকল অনিয়ম এর কারণে বিগত জেলা পরিষদের প্রশাসক মরহুম ডাঃ মোখলেছুর রহমান দুর্নীতিবাজ সরোয়ারকে অফিসের কোন প্রকার কাজ কর্ম করা থেকে বিরত রাখেন।

 

গত ২২ জুন স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় জেলা পরিষদের দোকান সম্পর্কিত জরুরী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয় পরিষদের অনুমতি ছাড়া অন্যকে হস্তান্তর করেছেন অথবা ভাড়া দিয়েছেন যা চুক্তিপত্রের শর্তের পরিপন্থি। অনুমতি ছাড়া দোকান হাস্তান্তর ভাড়া দেয়া হয়েছে প্রমািিণত হলে বরাদ্দাদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জানা গেছে, বরিশাল জেলা পরিষদের যত দোকান রয়েছে প্রকৃত মালিকরা তা চালায় না তারা কয়েক লক্ষ টাকা জামানত সহ অন্যত্র ভাড়া দিয়ে দেয়। গোপন সূত্রে জানা গেছে, মোজাহিদ ও ছরোয়ারের নামে বিনামেও অনেক স্টল।

 

অভিযোগ উঠেছে কোন সাংবাদিক তাদের কাছে তথ্য চাইলে তা তারা দেয়না। বলে চেয়ারম্যান জানে আমরা জানিনা। তার কাছ থেকে তথ্য নিন। ছরোয়ার উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত আছেন। তার ভগ্নিপতি মন্ত্রণালয় চাকুরী করেন বলে তিনি ধরাকে স্বরাজ্ঞান করেন না। বরিশাল জেলায় যত খেয়াঘাট আছে তা সব দুর্নীতিবাজ ছরোয়ারের দখলে। বৈশাখ মাস আসলে তার ঈদের মাস হয়ে যায়। খেয়া ঘাটের ইজারা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে এক এক জন মাঝির কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করেন তিনি। গত বছর বাবুগঞ্জের খেয়ার ইজারাদার পারভেজ এর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময় কম রেটে ঘাট দেয়ার কথা ছিলো। তাই ওই ইজারাদার ঘাটের রেট বারায়নি।

 

পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এই উৎকোচের খবর জানতে পেরে তার কাছ থেকে খেয়াঘাটের ফাইল নিয়ে নেন। পরে চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে পুনরায় আবার খেয়ার ফাইল তার দখলে নিয়ে নেয়। জেলা পরিষদে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরা প্রকল্প দিয়ে থাকেন কিন্তু সরোয়ার টাকা ছাড়া কোন ফাইল ছাড়েনা। প্রতিটি প্রকল্পের ফাইল বাবদ ১ হাজার টাকা করে আদায় করেন তিনি। স্টাম্প প্রিন্ট বাবদও আলাদা টাকা নেয়া হয়। তিনি সে টাকা অফিসের একজন নারী কর্মচারীর মাধ্যমে আদায় করেন। কোনো মানুষ সেবা নিতে আসলে সে বলে ওর সাথে যোগাযোগ করেন।

 

ওর কাছে কাগজপত্র জমা দেন ও আপনাকে চেকের ব্যবস্থা করে দিবে। সে নারী কর্মচারী হওয়ার সুবাদে সকল কর্মকর্তাদের সাথে তার ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে চেক ও হয় তারাতাড়ি। টাকা না দিলে এখানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। এ যেন দুনিয়ার দোজগ খানা। সেবাগ্রহীতাদের কোনো তথ্যই দেয় না কর্মকর্তারা। বলে ওই টেবিলে যান। আর একজন বলে আমি জানিনা অমুকে জানে।

 

জানা গেছে, দক্ষিণ বংগের সিংহ পুরুষ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ¦ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে গৌরনদীতে নলহিংহলপট্টি আকন বাড়ি জামে মসজিদে একটি প্রকল্প দেন। প্রকল্পের টাকা ছাড়ানোর জন্য হারুন আকন কয়েক দিন জেলা পরিষদে গিয়েছেন কিন্তু ছরোয়ার আজ না কাল আসেন, দুই দিন পর আসেন বলে কাল ক্ষেপন করেন।

ভুক্তভুগি হারুন আকন বলেন, করোনার কারন দেখিয়ে আমাকে বলা হয়েছে পরে আসেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু হারুন আকনই নয় এ রকম অনেক লোক সেবা নিতে আসলে ছরোয়ার এর কাছে জিম্মি হয়ে যায় টাকা ছাড়া এখানে কোনো ফাইল চলে না এমন অভিযোগভুক্তিভূগীদের। ফাইল আটকে যাওয়ার ভয়ে তারা মুখ খেলেন না। এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে,বরিশাল শিশু পার্কের পাশে জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন একটি ডাক বাংলো ও একজন কেয়ারটেকার রয়েছে।কিন্তু ডাক বাংলোর ভবন বাদে বাকী সকল জমি মাওলানা মুজাহিদ নিয়ম বহির্ভূত ভাবে নামে বেনামে লিজ দিয়েছেন। জানাগেছে, বর্তমানে জেলা পরিষদ দুর্নীতির মহারাজ্যে পরিনত হয়েছে।

 

এদিকে খবর নিয়ে জানা যায়, জেলা পরিষদের মাস্টার রোলের কর্মচারীরা যেদিন অফিসে কাজ করতে আসবে তারা সে দিনের বেতন পাবেন। কিন্তু জেলা পরিষদের নিয়ম উল্টো। শুক্র- শনি বার সহ সকল সরকারি দিনের বেতন সহ মোট ৩০ দিনের বেতন ১৮ হাজার টাকা পান তারা। মাস্টার রোলের কোনো কর্মচারী ছুটিতে গেলেও তারা পুরো মাসের বেতন তোলেন। অথচ যারা পারমানেন্ট স্টাফ তারা শুক্র-শনিবার সহ ছুটির দিনে ডিউটি করেন। তারা কোনো সুযোগ সুবিধা পান না। কোন আইনে কার ক্ষমতার বলে মাস্টার রোল কর্মচারীরা বাসায় থেকেও ৩০ দিনের বেতন ভোগ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পারমানেন্ট কর্মচারী জানান, আমি শুক্র-শনিবারও ডিউটি করি। অথচ মাস্টার রোল কর্মচারীরা শুক্র- শনিবার ছুটি ভোগ করে পুরো মাসের বেতন পান।

 

এ ব্যাপারে জানতে বরিশাল জেলা পরিষদের অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান,আমি নতুন যোগদান করেছি সব বিষয়ে আমার জানা নেই তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।টেবিলে হয়রানির
বিষয়ে তিনি বলেন,কোন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অভিযোগ পেলে সেই অসাধু কর্মচারীর বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

 

বরিশাল জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাওলাদ হোসেন ছানার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান,ভুক্তভোগীদের হয়রানির বিষয়ে জেলা পরিষদের মাসিক মিটিংয়ে অনেক আলোচনা হলেও কোন প্রতিকার মেলেনি। জেলা পরিষদের সদস্য জিল্লুর রহমান মিয়া জানান,জেলা পরিষদের সকল বিষয়ে মাসিক মিটিংয়ে আলোচনা হয়।মানুষকে হয়রানির বিষয়ে আমরা উথ্যাপন করেছি।কোন প্রতিকার পাইনি। শিশু পার্কের পাশে ডাক বাংলো ছাড়াও প্রায় ১০০ শতাংশ জমি আছে শুনেছি তা লিজ দেয়া হয়েছে।তবে কি প্রক্রিয়ায় দেয়া হয়েছে তা জানিনা।

 

জেলা পরিষদের সদস্য মুনাওয়ারুল ইসলাম অলি বলেন,১৩১ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ।কিছু অনিয়ম এখানে রয়েছে পর্যায়ক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে।তবে মন্ত্রনালয়ের কাছে বাধ্যবাধকতা থাকায় আমরা স্বাধীন ভাবে প্রকল্প অনুমোদন দিতে পারিনা।আমাদের হাতে সকল দায়িত্ব অর্পন করলে জনগন আরো বেশী সেবা পাবে। এদিকে মাওলানা মুজাহিদ ও ছরোয়ারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মুজাহিদকে একাধিক বার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি আর সরোয়ারের মুঠো ফোন বন্ধ
পাওয়াগেছে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]