আগৈলঝাড়ায় ৫’শ ২৮ বছরের পুরোনো বিজয় গুপ্তের গৈলা মনসা মন্দিরের বাৎসরিক পূজা

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত আগস্ট ১৬ সোমবার, ২০২১, ০৪:২৪ অপরাহ্ণ
আগৈলঝাড়ায় ৫’শ ২৮ বছরের পুরোনো বিজয় গুপ্তের গৈলা মনসা মন্দিরের বাৎসরিক পূজা

শামীম আহমেদ ॥ মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যর অমর কবি ও অমর কাব্য মনসা মঙ্গঁল এর রচয়িতা বিজয় গুপ্তের প্রতিষ্ঠিত মনসাকুন্ড নামে খ্যাত বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত পাঁচ’শ ২৮ বছরের পুরোনো মনসা মন্দিরের বাৎসরিক পূজা মহা আড়ম্বড়ের মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে।

৫শ ২৮ বছর আগে থেকে বাংলা শ্রাবন মাসের শেষ দিনে প্রতি বছর এ পূজা মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পূজার আগে চারদিন ব্যাপি মন্দির আঙ্গিনায় রয়ানি গান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও মহামারি করোনা ভাইরাসের কারনে তা স্থগিত করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালিত হবে মনসা পূজা।

মনসা মন্দিরে দেবী মনসার প্রতি হাজারো ভক্তবৃন্দ বিনয়াবনত শ্রদ্ধা, শঙ্খ, উলুধ্বনি, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে আর ধূপ-ধুনোর মাধ্যমে বাৎসরিক মনসা পূজা অর্চনা করবেন। পূজা উপলক্ষে বিভিন্ন স্থান থেকে দেশ-বিদেশের হাজারো নারী-পুরুষ, সাধু-সন্যাসী ও ভক্তের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো মনসা মন্দির আঙ্গিনা। মন্দির ও তাঁর আশপাশের এলাকায় হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা।

বাৎসরিক মনসা পূজা উপলক্ষে মনসা মঙ্গল উপজীব্য করে রয়ানি পালাগান শেষে মনসা মঙ্গল থেকে কাহিনী চয়ন করে শিল্পীরা নৃত্য গীতের মধ্য দিয়ে মনসা মঙ্গল কাব্যের রস ফুটিয়ে তোলেন তাদের গানে। যুগ-যুগান্তর থেকে রয়ানি গানের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ মনসা পূজার মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টায় মনসা দেবীর পূজা করে আসছেন। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারনে স্থগিত করা হয়েছে এবারের রয়ানি গান।

ঐতিহাসিক মতে, মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি বিজয় গুপ্ত “বিষহরি” (বিষ হরণকারী) মনসা দেবীর স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে নিজ বাড়ির দীঘিতে স্বপ্নে পাওয়া পূজার ঘট পেয়ে গৈলা গ্রামের নিজ বাড়িতে বিজয় গুপ্ত ৫’শ ২৮ বছর পূর্বে মা মনসার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং পাশ্ববর্তি বকুল গাছের নিচে বসে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়েই তিনি মনসা মঙ্গল রচনা করেছিলেন। দেবী তাকে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে বলেছিলেন “তুই নাম চাস না কাজ চাস ?” উত্তরে বিজয় গুপ্ত বলেছিলেন “আমি নাম চাই” সেই থেকে অদ্যাবধি ওই মন্দিরে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে প্রতি বছর শ্রাবনের সংক্রান্তি তিথীতে বাৎসরিক পূজা উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা গ্রামে ইংরেজী ১৪৫০ সালে জন্মগ্রহন করেন বিজয় গুপ্ত। তাঁর বাবার নাম সনাতন গুপ্ত ও মায়ের নাম রুক্সিনী দেবী। বিজয় গুপ্ত ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ৪৪ বছর বয়সে তিনি বিষ হরি দেবী (বিষ হরণকারী) মনসা কর্তৃক স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ফুল্লশ্রী গ্রামের মনসা কুন্ড নামে খ্যাত বর্তমান মন্দিরের পাশ্ববর্তী দিঘী থেকে স্বপ্নে প্রাপ্ত ঘট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মন্দিরে। এরপর তিনি (বিজয় গুপ্ত) দেবী পদ্মা বা দেবী মনসা কর্তৃক পূণরায় স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে দিঘীর পাশ্ববর্তী সাইতান গাছের নীচে বসে নবাব হোসেন শাহ’র শাসনামলে (১৪৯৪ সালে) পদ্মপুরাণ বা মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের অমরগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থ রচনা করায় কবি বিজয় গুপ্ত সুলতানের দরবারে ‘মহাকবি’ উপাধি লাভ করেন। বিজয় গুপ্ত বিভিন্ন এলাকায় কিছুকাল স্ব-দলবলে মনসা মঙ্গল গানও করেন। এরপর তিনি তীর্থ ভ্রমনের উদ্যেশ্যে কাশীধাম গমন করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক সেনারা বিজয় গুপ্তের প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দিরে ব্যাপক লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। রেখে যায় মন্দিরে তার প্রতিষ্ঠিত ঘট। স্বাধীনতার পর থেকে ওই ঘটেই চলে আসছিল নিত্যদিনের পূজা অর্চনা।

কবি বিজয় গুপ্ত স্মৃতি রক্ষা, মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অজয় দাশ গুপ্ত বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক সেনারা বিজয় গুপ্তের মন্দির থেকে মনসা দেবীর বিগ্রহ চুরি করে নেয়ার পর ২০০৮ সনে ঢাকাস্থ সনাতন ধর্মের সম্প্রদায়, বিদেশে অবস্থানরত ভক্তবৃন্দদের আর্থিক অনুদানে ১ টন ওজনের পিতলের তৈরি মনসা দেবীর প্রতিমা পুঃণস্থাপন করা হয়। এরপর হাতে নেয় হয় নাট মন্দির সংস্কারের কাজ। যার উন্নয়ন কাজ বর্তমানে শেষ হয়েছে। প্রতি বছর মা মনসার মন্দিরের বাৎসরিক পূজা উপলক্ষে পূজা অর্চনা, ছাগ বলিদান, ভোগের প্রসাদ ভক্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

কবি বিজয় গুপ্ত স্মৃতি রক্ষা, মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তারক চন্দ্র দে জানান, পূজা অনুষ্ঠানে একটি বাক্য উচ্চারিত হয়, তা হল; “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”-এ বাক্যকে ধারন করে জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে বাৎসরিক পূজায় দেশ-বিদেশের ভক্তবৃন্দদের সমাগম ঘটে এখানে।

মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সাধারন সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল দাশ গুপ্ত জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও পূজা উপলক্ষে মানত দিতে দেশ-বিদেশের হাজার-হাজার ভক্তবৃন্দ পূজার্ঘ্য নিয়ে আসতে শুরু করেছেন।

আগৈলঝাড়া থানা পরিদর্শক মো. গোলাম ছরোয়ার জানান, নিরাপত্তা ও শৃংখলার জন্য মন্দির ও পূজা কমিটির নিজস্ব কর্মীর পাশাপাশি থানা পুলিশও ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]