আড়ালে কেন আখুন্দজাদা?

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত আগস্ট ৩০ সোমবার, ২০২১, ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
আড়ালে কেন আখুন্দজাদা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তালেবানের অনেক নেতা কাবুলে প্রবেশ করেন— যাদের মধ্যে অনেক প্রভাবশালী কমান্ডো, মাদরাসার সশস্ত্র শিক্ষার্থী এবং বছরের পর বছর ধরে নির্বাসনে থাকা বিবর্ণ নেতারাও রয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম ছিলেন— এই গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।

 

কিন্তু রোববার হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বর্তমানে আফগানিস্তানে আছেন বলে নিশ্চিত করে তালেবান বলেছে, শিগগিরই তিনি প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে হাজির হবেন। তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, ‘তিনি বর্তমানে কান্দাহারে আছেন। একেবারে প্রথম থেকেই সেখানে বসবাস করছেন তিনি।’

 

‘তিনি শিগগিরই জনসম্মুখে আসবেন,’ যোগ করেন তালেবানের উপ-মুখপাত্র বিলাল করিমি। তালেবানের তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেতা আখুন্দজাদা। ২০১৬ সাল থেকে তিনি তালেবানের প্রধান হিসেবে আছেন, ওই সময় এই গোষ্ঠীটির চরম সংকটে তিনি নেতার ভূমিকায় হাজির হন। ক্ষমতার তিক্ত দ্বন্দ্বে তালেবানে সাময়িক ভাঙনের পর জিহাদি আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার বিশাল চ্যালেঞ্জের দায়িত্ব ধর্মীয় এই নেতাকে দেয়া হয়।

 

ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি আঘাতের পর দলের ভেতরে ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ লড়াই শুরু হয়েছিল। আখুন্দজাদার পূর্বসূরী এবং তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লাহ ওমরের মৃত্যুর সংবাদ গোপন রাখা নিয়ে সংকটের মুখে পড়েছিল গোষ্ঠীটি। তালেবানে আখুন্দজাদার দৈনন্দিন ভূমিকা সম্পর্কে এখনও খুব কমই জানা যায়। তার জনসম্মুখে উপস্থিতি মূলত ইসলামি ছুটির দিনগুলোতে বার্ষিক বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমিত ছিল।

 

তালেবানের একটি ছবি প্রকাশ ছাড়া আধ্যাত্মিক এই নেতাকে কখনও জনসম্মুখে দেখা যায়নি। এমনকি তিনি কোথায় আছেন বা তার আস্তানা কোথায় সেটিও ছিল পুরোপুরি অজানা। গত ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও তালেবান তাদের প্রধানের গতিবিধির ব্যাপারে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে আখুন্দজাদার অবস্থান সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা চাইলে আপনি শিগগিরই তাকে দেখবেন।’

 

তালেবানের বিভিন্ন পক্ষের প্রধানরা সম্প্রতি কাবুলের মসজিদে মসজিদে প্রকাশ্যে প্রচারণা, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আফগান ক্রিকেট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

গোপনীয়তার ইতিহাস

তালেবানের শীর্ষ নেতাদের আড়ালে রাখার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। গোষ্ঠীটির রহস্যময় প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর জনসম্মুখে খুব কমই আসতেন। এমনকি ১৯৯০-এর দশকে তালেবান ক্ষমতায় থাকাকালীনও কাবুলে তেমন বেশি ভ্রমণ করতে দেখা যায়নি। অনেকটা আড়ালে থাকলেও তার কথা মতোই চলতো তালেবান। কিন্তু একই ধরনের শ্রদ্ধা বা সম্মান নিয়ে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কোনও একক ব্যক্তির আবির্ভাব কখনও ঘটেনি।

 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া কর্মসূচির প্রধান লরেল মিলার বলেন, ‘আখুন্দজাদা তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের মতো একই ধরনের বিশিষ্ট পন্থা গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয়।

 

এই গোপনীয়তা নিরাপত্তার কারণে হতে পারে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় তালেবানের প্রধানের পূর্বসূরী মোল্লা আখতার মনসুর হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন লরেল মিলার।

 

ফরাসী বার্তাসংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘তালেবানের একজন মুখপাত্র ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাদের নেতা শিগগিরই জনসম্মুখে আসবেন। তার মৃত্যু নিয়ে যে গুজব রয়েছে তা দূর করার জন্য তিনি এটি করতে পারেন। কিন্তু এটাও সম্ভব যে জনসম্মুখে আসার পর তিনি মোল্লা ওমরের মতো আবারও আড়ালে যেতে পারেন এবং দূরবর্তী পদ্ধতি অবলম্বন করে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।’

 

আখুন্দজাদার স্বাস্থ্য নিয়ে বছরের পর বছর ধরে গুজবে জ্বালানি জুগিয়েছে তার অনুপস্থিতি। তালেবানের এই নেতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অথবা বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন বলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। এসব গুজব উড়িয়ে দেওয়ার জন্য তালেবান এখন পর্যন্ত তেমন কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি।

 

আফগানিস্তানজুড়ে তালেবানের বিভিন্ন পক্ষ রয়েছে; যারা বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। তালেবানের নেতারা এই গোষ্ঠীটির প্রধান মোল্লা ওমরের মৃত্যুর তথ্য কয়েক বছর ধরে গোপন রাখার খবর ২০১৫ সালে প্রকাশ্যে আসে। সেই সময় তালেবানের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পর এই গোষ্ঠীটি থেকে প্রধান একটি পক্ষ বিভক্ত হয়ে যায়।

 

কয়েক দশকের সংঘাতে তালেবানের হাজার হাজার সৈন্য নিহত, শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যা অথবা কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দি করার পরও তালেবান ঐক্যবদ্ধ থেকেছে।

 

এবারে যুদ্ধের ময়দান থেকে শাসনের মসনদে আসা তালেবানের জন্য বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে ক্ষমতা সুসংহত করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও ধরনের ক্ষমতাশূন্যতা গোষ্ঠীটিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
অন্যরা বলছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্ত প্রস্থান না হওয়া পর্যন্ত আগামী দিনগুলোতে এই গোষ্ঠীটি কেবল তার সময়কেই ধারণ করতে পারে। পাকিস্তান-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ গুল বলেন, ‘যতদিন বিদেশি সৈন্যরা আফগানিস্তানের মাটিতে থাকবে ততদিন পর্যন্ত নিজেদেরকে জিহাদের ময়দানের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে তালেবান। একই সঙ্গে পশ্চিমা সৈন্যরা পুরোপুরি চলে না যাওয়া পর্যন্ত নেতাকে লুকিয়ে রাখবে।’

‘এ কারণেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতাকে এখনও সামনে আসেননি।’




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]