অবশেষে যশোরের জামাই হলেন সেই সংগ্রামী লিমন

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৩ শুক্রবার, ২০২১, ০৪:৩৩ অপরাহ্ণ
অবশেষে যশোরের জামাই হলেন সেই সংগ্রামী লিমন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো সেই লিমন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। কনে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর এলাকার সরখোলা গ্রামের জাহিদুল ইসলাম টিটোর বড় মেয়ে রাবেয়া বসরী (১৯)।

শুক্রবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কনের বাড়িতে দুই লাখ টাকা দেনমোহরে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়।

 

লিমন হোসেন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে। ১০ বছর আগে র‌্যাবের গুলিতে তার পা হারানোর ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। লিমন এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। সেই লিমন এখন সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক।

 

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যরা জানান, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হোসেনের বাড়িও অভয়নগরের সরখোলা গ্রামে। তিনিই এ বিয়ের মধ্যস্থতা করেছেন। কনে রাবেয়া বসরী দুই ভাইবোনের মধ্যে বড়। তিনি এ বছর নওয়াপাড়া কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

 

বরপক্ষের ১০ জন শুক্রবার দুপুর ১২টার আগে কনে রাবেয়া বসরীর বাড়িতে পৌঁছান। বরপক্ষের মধ্যে ছিলেন-লিমন হোসেনের বাবা-মা ও নিকট আত্মীয়রা। জুমার নামাজের আগেই দুই লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে পড়ান স্থানীয় কাজি। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ছোট পরিসরে উৎসবমুখর পরিবেশে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার গায়েহলুদ সম্পন্ন হয়।

রাবেয়ার বড়চাচা আহসান হাবিব খোকন জানান, লিমনের একটি পা নেই। সেই ঘটনা তারা জানেন। কিন্তু তার যোগ্যতা দেখে জেনেশুনেই লিমনের সঙ্গে তারা মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

 

লিমন হোসেন জানান, বাবা-মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছেন। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। নতুন জীবনে তিনি সবার দোয়া চেয়েছেন।

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিমন হোসেন বলেন, আমার এ পর্যন্ত আসার পেছনে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং দেশের গণমাধ্যমকর্মী ও মানবাধিকার কমিশনের অবদান কখনও ভুলতে পারবো না। ঝালকাঠির সাংবাদিকদের কথাও ভোলা যাবে না। আমার বিয়েতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আসতে চাইলেও অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। তার কাছে দোয়া চেয়েছি।

 

অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যই আইন বিষয়ে পড়েছেন বলে জানান লিমন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কথা জেনেও আমার স্ত্রী রাবেয়া বসরী আমাকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছেন।

 

কনে রাবেয়া বসরী বলেন, লিমন একজন সংগ্রামী মানুষ। জীবনযুদ্ধে তিনি জয়ী হয়েছেন। সংগ্রাম করে নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন। আশা করি দাম্পত্যজীবনে তিনি আরও দায়িত্বশীল হবেন। আমি সবকিছু বুঝেই বিয়ে করেছি।

রাবেয়া বসরীর বাবা জাহিদুল ইসলাম টিটো বলেন, আনুমানিক ছয় মাস আগে ড. ফুয়াদ হোসেনের মাধ্যমে লিমনের সঙ্গে রাবেয়ার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়। ছেলে-মেয়ে উভয়ের মতামতের ভিত্তিতেই বিয়ে হয়েছে। মেয়ে ও জামাইয়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন তিনি।

 

লিমনের বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, আমার ছেলেকে তো মেরেই ফেলেছিল। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছে। আজ বিয়ের কাজ শেষ হলো। ওদের দুইজনের জন্য আপনারা দোয়া করবেন।

 

২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নে নিজ বাড়ির পাশের একটি বাগানে নিয়ে লিমনের পায়ের গুলি করেন র‌্যাব সদস্যরা। এরপর লিমনসহ আটজনের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও অস্ত্র রাখার অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লিমনকে বাঁচাতে তার গুলিবিদ্ধ পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা। এরপর লিমনের মা বাদী হয়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন।

 

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে মায়ের সঙ্গে মাঠে গরু আনতে গিয়েছিলেন লিমন হোসেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন র‌্যাব সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। লুৎফর রহমান নামের এক র‌্যাব সদস্য লিমনের শার্টের কলার ধরে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। লিমন তখন র‌্যাব সদস্যদের বলেছিলেন, তিনি সন্ত্রাসী নন; একজন ছাত্র। এরপর র‌্যাব সদস্য লুৎফর রহমান মাথায় গুলি না করে লিমনের পায়ে গুলি করেন।

 

মামলা চলাকালীন কারাগার হাসপাতালে থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যান লিমন। জামিনে বেরিয়ে ২০১৩ সালে পিরোজপুরের কাউখালী কাঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৮ সালে ঢাকা সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষা সহকারী পদে যোগদান করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একই বিভাগের সহকারী প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন অদম্য লিমন হোসেন।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]