ধর্মে-রাজনীতিতে গুরুর দীক্ষায় শিষ্য যখন..

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত এপ্রিল ২৩ শুক্রবার, ২০২১, ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
ধর্মে-রাজনীতিতে গুরুর দীক্ষায় শিষ্য যখন..
সোহেল সানি :: মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মতোই পিতৃতান্ত্রিক সমাজেও গুরু দীক্ষা, গুরুভক্তি, গুরুপুজা, বন্দনা সবই বিরাজমান আজও। ছিলো সর্বযুগে সবদেশে। হয়তো থাকবে অনন্তকাল কেয়ামত পর্যন্ত । সৃষ্ট রাজনীতির মতবাদে গুরুজীর “দীক্ষাপাঠগ্রহণ” প্রকাশ্য অপ্রকাশ্যে দেদীপ্যমান। শিষ্যত্ব কবুলে কেউ  ডানহস্ত,কেউ বামহস্ত,কেউ-বা চক্ষু -কর্ণ, কেউ-বা বুক-পিঠ আবার কেউ বা গুরুর মানসকন্যা-মানসপুত্র কেউ  বা  গুরুজীর জন্য জান-প্রাণ, আরো কত কি! গুরুমনে অবস্থান করতে হতে হলে চাই যোগ্যতার চেয়েও অতি ভক্তির উত্তম অস্র। এর প্রতি মূল্য দেন সমাজপতি,রাজপতিরা।
এখনকার রাজনৈতিক গুরুরাও প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে মনের অজান্তে শিষ্যদের কাছ থেকে এমন ভক্তিই আশা করেন। ‘পা’ না পেলে গুরুর ‘পাদুকা’ ছুঁয়ে ভক্তিপ্রদর্শণ করাও পবিত্র আমানত শীর্ষ শিষ্যর বেলায়। যোগ্য শিষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোন গুরুর মধ্যেই যেমন অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, ঠিক অমনি শিষ্যদল না থাকলে যুদ্ধ বিগ্রহের দ্বারা গুরুজীর এলাকার বিস্তার ঘটিয়ে রাজ্যপতি হয়ে ওঠাও কোন ব্যক্তির সুযোগ হতো না। শিষ্যত্বদানের জন্য সব গুরুই কোমলমতি ছাত্র বা বিদ্যার্থীদের বেছে নেন।
ধর্মকে এজন্য হাতিয়ার হিসাবে কেউ বেছে নেন আবার কেউ বা ধর্মকেই অস্বীকার করে নিজেই প্রভুর আসন পেতে চেয়ে শেষে ধ্বংস হয়ে যান। যার বড় উদাহরণ ফেরাউন, নমরুদ, শাদ্দাদ গং। সৃষ্টির আদমকাল হতেই কর্তৃত্ববলে বলীয়ান বা বলীয়সী হবার জন্যে সামাজিক জীব হিসাবে মানুষ সমাজপতির কল্যাণেই নিজের কল্যাণ খুঁজে। গুরুভক্তিতে চরম শপথে দীক্ষিত হয়ে আসেন তাঁরা। এ সম্পর্কে যাঁদের “জানেওয়ালা” বলে জাহির করেন, তাঁদের জন্য নয়,আমার এ লেখা বরং  অজানেওয়ালা বিদ্যার্থীদের জন্যই।
তাঁদের মনের দূয়ারের কড়া নেড়ে বলছি,আমরা রাজধানীর বুকের ওপর চেপে বসে আছি জগদ্দল পাথরের মতো। জীবন-জীবিকার সন্ধানে আসা অন্য সকলের মতো আমারও আসা। যখন ঢাকায় পা রাখি তখন আমাদের প্রিয় রাজধানীর চেহারাটায় এত ক্ষত ছিলো না। বরিশালের কীর্তনখোলার নদীর মতোই শুদ্ধজলে ডালিমরসের মতোই জ্বলজ্বল করতো ঢাকার বুড়িগঙ্গার জলও।
সেসময়ে বৃষ্টির জলও রাজধানীতে এমন জলাবদ্ধতার কারণ হতো না। অথচ, কি দুঃসহ ভোগান্তি ভোগবিলাসী রাজধানীবাসীর। যেন রাজপথের যানজট একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। যানজটের খবরলেখক বা খবরপাঠক ছাড়া এসব খবরা-খবরে চোখ রাখাও হয়ে ওঠেনা কারো। মনে না ধরলেও পত্রিকার পাতায় কিংবা টিভির পর্দায় প্রদর্শিত এসব বড় বড় খবর কেবল গুরুত্ববহন করে সরকারের কাছে। প্রতীকারের তাগিদে, বিবেচনার অপেক্ষায়। ত্যক্তবিরক্ত হতে হতে পেট এসব জ্বালা হজম করে ফেলেছে।
লগডাউনের আগে আমি ঘুরেফিরে তিনটি রোডের একদিনের ভোগান্তির কথা বলছি। রোড তিনটি হলো ফুলার রোড, হেয়ার রোড ও বেইলী রোড। এলাকার অবস্থান থেকে মনে হতে পারে তিন সহোদর।  না, পদাধিকার ক্রমে ফুলার, হেয়ার ও বেইলী পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেঃ গভর্নর।  প্রাদেশিক শীর্ষ পদ। বঙ্গভঙ্গে এ লেঃ গভর্নর পদবীর জন্ম। এর বিকাশ নিঃশেষও বঙ্গভঙ্গে। লর্ড কার্জন, লর্ড মিন্টো ও লর্ড হার্ডিঞ্জ ছিলেন এই তিনজনের প্রভুসম গুরু। বঙ্গভঙ্গ  বিদায়ে এ ছয় জনেরই বিদায় ঘটে আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে।
সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ও লেঃ গভর্নর বেইলী বঙ্গভঙ্গ রদ করে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গকে একপ্রদেশে মিলনের প্রস্তাব পাঠান ব্রিটিশ কমন্সসভায়। সম্রাট পঞ্চম জর্জ  দিল্লীর দরবার হলে ১৯১১ বঙ্গভঙ্গ রদ করার ঘোষণা দিয়ে বাংলাকে প্রেসিডেন্সীকে কেন্দ্রীয় শাসন পরিষদের অধীন করেন।  প্রথম গভর্নর হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন লর্ড কারমাইকেল। তিনজনের বাজারদর সমান।
যাহোক প্রসঙ্গ কেন এলো তা বলছি। আমি একটি রিকশায়। সিএনজিচালিত অটোযান না পেয়ে। আচমকা পেছন থেকে ধাক্কা। ফিরে দেখি, রিকশাকে মেরে দিয়েছে যাত্রীবহনকারী একটি দামী জিপ। পড়ে যাবার উপক্র হলেও কোনমতে নিয়ন্ত্রন রাখতে পারলাম। চোখের সামনে ” সিদ্ধেশ্বরী কালি মন্দির”। রিকশাচালক মন্দিরঘেঁষা ছোট্ট গলি দিয়ে বেইলী রোড হয়ে পল্টনে যাবে। এসেছি আঁকাবাকা পথ ধরে। বেরুতে চাইলো। কিন্তু কালি মন্দির পর্যন্ত এসেই জটলা। সড়ক বা পরিবেশ মন্ত্রী এমন শিকার হলে আঁচ করতে পারতেন শব্দদূষণ কারে কয়? মন্দিরের গায়ে সাঁটানো কয়েকটা পোষ্টারের দিকে চোখ পড়লো। দেখে আমার বিদ্যার্থীমনটা ধাওয়া করলো।
কালোত্তীর্ণ একটা ঘটনার পিছু নিতে। রাজনীতিতে দীক্ষা পুজিতমনও এর সাক্ষাত নেই। তবুও নাভিশ্বাসী জনমনে ঠাঁই খুঁজে নিতে হয় সমাজপতি বা রাজ্যপতিদের। তাঁদেরও দায়িত্ব কাঁধে চাপানোর আগে গুরুভক্তির শপথে দীক্ষা নিতে হয় নানা উপায়ে। আধুনিক রাষ্ট্রিক যুগেও রাজা-বাদশা, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী,  সুলতান-যুবরাজ, পোপ-পতি-নৃপতি, নবাব-নায়েব, বড়লাট-ছোটলাট, ভাইসরয়, গভর্নর -জেনারেল এবং উজির-নাজিরদেরও সেকালেও  শপথের নামে দীক্ষিত হতে হতো।
এসব পদপদবী প্রাচীনতার গর্তে ম্লান হলেও শব্দগতভাবে আক্ষরিক এবং পদবীধারীর আলংকারিক চাকচিক্কের পোষাক ও পরিচ্ছদীয় পরিবর্তন সাধারণের কাতারে নিয়ে আসা হলেও দীক্ষিত হবার কার্যপ্রণালী এক এবং অনেকটাই অভিন্ন রয়ে গেছে।
পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রপতি,প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীকে গণপ্রতিনিধির প্রতি শপথ গ্রহণ করতে হয়। সেই প্রাচীন সংস্কৃতির আবহাওয়াকে বলবৎ রেখেই এই দীক্ষা। গণতন্ত্রের যুগেও গোপনীয় শপথ সংস্কৃতিমত চালু রয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থ ওপর হস্ত রেখেই সেই শপথ নিজেদের রচিত বিধি বিধানের প্রতি। সাধারণ মানুষই মূল কথা। এখনও দেখছি স্মরণে কালি মন্দির প্রসঙ্গটি তামাদি হয়নি।
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলায় সবচেয়েও সহিংস ঘটনার জন্ম দিয়েছিল দুটি  সংগঠন  “যুগান্তর” ও ” অনুশীলন সমিতি”। সশস্র সংগঠন। এই ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের বিরুদ্ধে যারা ভুমিকা রাখতে চেষ্টা করছিলো, তাঁদেরকেই মেরে ফেলার নীতিগ্রহণ করছিল হিন্দুত্ববাদী এ দুটি চরমপন্থী জঙ্গী সংগঠন। এখন দেখছি চরমপন্থী মুসলিম জঙ্গি সংগঠন হেফাজতসহ নানা নামে। গুরুভক্তি কারে বলে তা দেখাচ্ছে ধর্মান্ধ কওমী মাদ্রাসার শিষ্য শিক্ষার্থীরা। এদের পরিণতি তবে কি?
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস বিশ্লেষক।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]