রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতিসহ যেসব বর্ণনা ও দোয়া পড়া হবে আজ

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত এপ্রিল ২৬ সোমবার, ২০২১, ০৫:১১ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতিসহ যেসব বর্ণনা ও দোয়া পড়া হবে আজ

ইসলাম ডেস্কঃ কুরআন নাজিলের মাসে, কুরআনের আলোকে জীবন গড়ার মাস রমজান। মাসজুড়ে কুরআন তেলাওয়াতে হেদায়েত পাবে রোজাদার মুসলমান। নবি-রাসুলদের জীবনী ও তাদের প্রয়োজনের সময় পড়া দোয়াগুলো হবে রোজাদারের জন্য পথ ও পাথেয়।

এ সুরায় ইসলামি রাষ্ট্রের ৪টি মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহ। রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর এ ৪টি বিধান বাস্তবায়নই মুমিনের প্রথম ও প্রধান কাজ। আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
– ‘তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ দান করলে-
১. তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে;
২. জাকাত ব্যবস্থা বিন্যস্ত করবে;
৩. আর সৎকাজে আদেশ (বাস্তবায়ন করবে) দেবে আর
৪. অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারভূক্ত।’ (সুরা হজ : আয়াত ৪১)

আবার বিপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং বিপদমুক্ত হওয়ার ঘোষণা। যেভাবে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম কঠিন বিপদে পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। মাছের পেটে ঘোর অন্ধকারে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের এ দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেছিলেন। সে ঘটনাও ওঠে এসেছে এ সুরায়। আল্লাহ বলেন-
‘আর মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন, তিনি রাগ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধরতে পারব না। অতপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেন-
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।
অর্থাৎ তুমি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গোনাহগার।’

ক্ষমার দশকে এসে আজ ১৪তম তারাবিহ নামাজ পড়বে রোজাদার। আজকের তারাবিহতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সুরা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা আম্বিয়া (১-১১২) এবং সুরা হজ (১-৭৮)। আজকের তারাবিহতে ১৭ পারার তেলাওয়াত সম্পন্ন হবে। এ সুরা দুইটিতে ১৮ জন নবি-রাসুলের বর্ণনা এসেছে।

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অনেক-নবি রাসুল পাঠিয়েছেন। সব নবি-রাসুলদের দাওয়াতের স্লোগান ছিল এক ও অভিন্ন। সে সম্পর্কে প্রিয় নবিকে জানাতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘(হে রাসুল!) আপনার আগে আমি যে রাসুলই পাঠিয়েছি, তাকে এ (দাওয়াতের) নির্দেশ দিয়েই পাঠিয়েছি যে-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
‘আমি (আল্লাহঃ) ব্যতিত অন্য কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ২৫)

> সুরা আম্বিয়া (১-১১২)
মানুষের আক্বিদা বিশ্বাস নিয়ে মক্কায় নাজিল হয়েছে সুরা আম্বিয়া। ইসলামের প্রথম যুগের সুরা এটি। ১৮ জন নবি-রাসুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এ সুরায়। সুরাটিতে দাওয়াতের ইতিহাস স্থান পেয়েছে।

নবি রাসুলদের দাওয়াতের ইতিহাস, পদ্ধতি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া হয়েছে এক অন্যরকম সান্ত্বনা। কারণ এতে ওঠে এসেছে, তৎকালীন অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে এ ১৮ জন নবির আচরণ, অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘটনা।

সবকিছুর পরও আল্লাহ তাআলা সব নবি-রাসুলকে যেভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছেন সে আলোচনাও রয়েছে এ সুরায়। এ সুরার অধ্যায়নই মুমিন মুসলমানকে দ্বীনের দাওয়াত ও আমলে একনিষ্ঠ হতে সহায়তা করবে। পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার দিকে নিয়ে যাবে।

সুরাটির সংক্ষিপ্ত আলোচ্যসূচি-
বিচার দিবসের বর্ণনায় শুরু হবে তারাবিহ। প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিচার দিবসের কথা তুলে ধরেছেন। দে দিন সম্পর্কে অবিশ্বাসীরা ছিল চিন্তাহীন। আল্লাহ বলেন-
– ‘মানুষের হিসাব-কিতাবের সময় নিকটবর্তী; অথচ তারা বেখবর হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ১)

দুনিয়ায় আল্লাহর সব সৃষ্টি অনর্থক নয়, এ কথা অনেক সুরায় আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। এ সুরায়ও তার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আল্লাহ বলেন-
– ‘আকাশ পৃথিবী এতদুভয়ের মধ্যে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি ক্রীড়া উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার কাছে যা আছে তা দ্বারাই তা করতাম, যদি আমাকে করতে হত।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ১৬-১৭)

– ‘বরং আমি সত্যকে মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি, অতপর সত্য মিথ্যার মস্তক চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, অতপর মিথ্যা তৎক্ষণাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তোমরা যা বলছ, তার জন্যে তোমাদের দুর্ভোগ।’ নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদতে অহংকার করে না এবং অলসতাও করে না। তারা রাত-দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ১৮-২০)

এ সুরায় উল্লেখিত ১৮ জন নবি-রাসুল হলেন-
১. হজরত মুসা আলাইহিস সালাম
২. হজরত হারুন আলাইহিস সালাম
৩. হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম
৪. হজরত লুত আলাইহিস সালাম
৫ হজরত ইসহাক আলাইহিস সালাম
৬ হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম
৭ হজরত নুহ আলাইহিস সালাম
৮ হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম
৯. হজরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম
১০. হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম
১১. হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম
১২. হজরত ইদরিস আলাইহিস সালাম
১৩. হজরত জুলকিফল আলাইহিস সালাম
১৪. হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম
১৫. হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম
১৬. হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম
১৭. হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং
১৮. রাহমাতুললিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

এ সুরায় আল্লাহ তাআলা তার বিশাল সৃষ্টির প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন। যা বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সব মানুষের জন্য চিন্তার বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
– ‘কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩০)

– ‘আমি পৃথিবীতে ভারী বোঝা (পাহাড়-পর্বত) রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩১)

– ‘আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ করেছি; অথচ তারা আমার আকাশস্থ নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩২)

– ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩৩)

মানুষ অমর নয়, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সে ঘোষণাও রয়েছে এ সুরায়। যা মানুষের জন্য হুশিয়ারি সংকেত। আল্লাহ বলেন-
– ‘আপনার আগেও কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে?’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩৪)
– ‘প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩৫)

শেষ বিচারের দিন বিচার ব্যবস্থা কেমন হবে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। কারো প্রতি কোনে ধরণের জুলুম করা হবে না সে ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন-
– ‘আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৪৭)

এ সুরায় হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার কাওমের সঙ্গে বিষদ আলোচনা করেছেন। যাতে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি ওঠে এসেছে। কিন্তু তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সঙ্গে এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অবশেষে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আগুড়ে পুড়িয়ে দেয়ার ঘৃণ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অবিশ্বাসী নমরূদ ও তার সম্প্রদায়। তাকে আগুণে নিক্ষেপ করে। সে সময়ে বর্ণনা এভাবে এসেছে-
– ‘তিনি বললেন, তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর, যা তোমাদের কোনো উপকার ও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না ? ধিক তোমাদের জন্যে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরই এবাদত কর, ওদের জন্যে। তোমরা কি বোঝ না? ‘ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৬৬-৬৭)
– ‘তারা বলল, একে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহিমরে ওপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৬৮-৬৯)

হজরত আইয়ুব আলাইহসি সালামের কষ্টের সময়ের বর্ণনাও এসেছে এ সুরায়। যেখানে পয়গাম্বর আইয়ুব আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা দান করেন। আল্লাহ বলেন-
– ‘এবং স্মরণ করুন আইয়্যুবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহবান করে বলেছিলেন- ‘আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ট দয়াবান। অতপর আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁর দুঃখকষ্ট দূর করে দিলাম এবং তাঁর পরিবরাবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশতঃ আর এটা ইবাদতকারীদের জন্যে উপদেশ স্বরূপ।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৩-৮৪)

বিপদে মাছের পেটে অন্ধকারে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দোয়া আল্লাহ কবুল করেছিলেন, সে ঘটনাও ওঠে এসেছে এ সুরায়। আল্লাহ বলেন-
– আর মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন, তিনি রাগ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধরতে পারব না। অতপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেন-
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।
অর্থাৎ তুমি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গোনাহগার।

– অতপর আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনি ভাবে বিশ্ববাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৭-৮৮)

উঠে এসেছে হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের আহ্বান ও দোয়ার কথা। যা আল্লাহ কবুল করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
– ‘আর স্মরণ করুন জাকারিয়ার কথা, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবান করেছিল-
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
উচ্চারণ : ‘রাব্বি লা তাজারনি ফারদাও ওয়া আংতা খাইরুল ওয়ারিছিন।’
অর্থ : হে আমার পালনকর্তা আমাকে একা রেখো না। তুমি তো উত্তম ওয়ারিস।
– ‘অতপর আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম, তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া এবং তার জন্যে তার স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম। তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৯-৯০)

আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীর জন্য প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছেন মর্মে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ১০৭)

আর প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব বিষয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। সব ফয়সালা ন্যায়ানুগ হওয়ার জন্যও তিনি আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করতেন। আল্লাহ তাআলা সুরা আম্বিয়ার শেষ আয়াতে তা তুলে ধরে বলেন-
– ‘পয়গাম্বর বললেন,
رَبِّ احْكُم بِالْحَقِّ وَرَبُّنَا الرَّحْمَنُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ
‘হে আমার পালনকর্তা, আপনি ন্যায়ানুগ ফয়সালা করে দিন। আমাদের পালনকর্তা তো দয়াময়, তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ১১২)

> সুরা হজ (১-৭৮)
সুরা হজ মক্কা নাকি মদিনায় নাজিল হয়েছে এ বিষয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ তাফসিরকারক বলেন, এ সুরাটি মিশ্র। এতে মক্কা ও মদিনায় অবতীর্ণ উভয় প্রকারের আয়াতই সন্নিবেশিত হয়েছে। এর কিছু আয়াত রাতে, কিছু আয়াত দিনে, কিছু আয়াত সফরে, কিছু আয়াত গৃহে অবস্থানকালে, কিছু আয়াত মক্কা, কিছু আয়াত মদিনায়, কিছু আয়াত যুদ্ধাবস্থায় এবং কিছু আয়াত শান্তি বিরাজমান অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছে।

এ সুরায় নাসেখ ও মানুসুখের আয়াতও নাজিল হয়েছে এ সুরায়। এ সুরা বিষয়বস্তুগুলো হলো-
– কিয়ামাতের ভূকম্পন সম্পর্কিত তথ্য; আল্লাহকে ভয় করার কথা দিয়ে শুরু হয়েছে সুরাটি। আল্লাহ বলেন-
‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার।’ (সুরা হাজ :আয়াত ১)

মায়ের গর্ভে মানব সৃষ্টির স্তর ও বিভিন্ন অবস্থার আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানব সৃষ্টির বর্ণনা দিয়ে বলেন-
– ‘হে লোকসকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও, তবে (ভেবে দেখ-) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। আর আমি এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় বের করি; তারপর যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পণ কর। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান থাকে না। তুমি ভূমিকে পতিত দেখতে পাও, অতঃপর আমি যখন তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা সতেজ ও স্ফীত হয়ে যায় এবং সর্বপ্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।’ (সুরা হজ : আয়াত ৫)

বাইতুল্লায় সকল মুসলমানের সমান অধিকারের তাৎপর্য; বাইতুল্লাহ নির্মাণ সম্পর্কিত আলোচনা; গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত হজের কর্যক্রমে সুন্দরভাবে সম্পাদনের বিষয়াবলীর আলোচনা; আল্লাহ বলেন-
– ‘যখন আমি ইবরাহিমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে।’ (সুরা হজ : আয়াত ২৬)
– ‘ আর এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সুরা হজ : আয়াত ২৭)

– ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাব গ্রস্থকে আহার করাও।’ (সুরা হজ : আয়াত ২৮)

– ‘এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে।’ (সুরা হজ : আয়াত ২৯)

কুরবানি করার বিষয়েও দিক-নির্দেশনা উঠে এসেছে এ সুরায়। কুরবানির বিধান ও তার গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছ পৌঁছায় না তা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা তা ঘোষণা করে বলেন-
– ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৪)
– ‘যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভীত হয় এবং যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্য্যধারণ করে এবং যারা নামায কায়েম করে ও আমি যা দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৫)

– ‘আর কা’বার জন্যে উৎসর্গীকৃত উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের যবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাচ্ঞা করে না তাকে এবং যে যাচ্ঞা করে তাকে। এমনিভাবে আমি এগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৬)

– ‘এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৭)
> রাষ্ট্র পরিচালনার ৪ মূলনীতি
এ সুরায় ইসলামি রাষ্ট্রের ৪টি মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহ। ক্ষমতা লাভের পর এ ৪টি বিধান বাস্তবায়নই মুমিনের কাজ। আল্লাহ বলেন-
– ‘তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ দান করলে-
১. তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে;
২. জাকাত ব্যবস্থা বিন্যস্ত করবে;
৩. আর সৎকাজে আদেশ (বাস্তবায়ন করবে) দেবে আর
৪. অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারভূক্ত।’ (সুরা হজ : আয়াত ৪১)

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মুসলিম উম্মাহর জন্য সতর্ককারী। তিনি সব বিষয়ে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক ও নসিহত পেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
– (হে রাসুল! আপনি) বলুন, হে লোক সকল! আমি তো তোমাদের জন্যে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ককারী। সুতরাং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যে আছে পাপ মার্জনা এবং সম্মানজনক রুজি।’ (সুরা হজ : আয়াত ৪৯-৫০)

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সফলকাম হওয়ার আমলের ঘোষণা দিয়েছেন। যে আমলে বান্দা হবে সফলকাম। আর তাহলো নামাজে যথাযথ রুকু ও সেজদা আদায় করা। ভালো কাজ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
– ‘হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর, সেজদা কর, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর এবং সৎকাজ সম্পাদন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা হজ : আয়াত ৭৭)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরা দুটি বুঝে পড়ার এবং এর দিকনির্দেশনা মেনে যথাযথ আমল করার মাধ্যমে দুনিয়া ও পরকালের সফলতা লাভ করার তাওফিক দান করুন। নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃbarishalcrimetrace@gmail.com