বরিশালের স্কুল শিক্ষক হাসান মাহমুদের কৃষি খামে মরুভূমির ফল

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত অক্টোবর ১২ মঙ্গলবার, ২০২১, ১০:১৬ অপরাহ্ণ
বরিশালের স্কুল শিক্ষক হাসান মাহমুদের কৃষি খামে মরুভূমির ফল

করোনা আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছে’- বলছিলেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আন্ধারমানিক ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক হাসান মাহমুদ সাইদ (৪৫)। টানা দেড় বছর দাপ্তরিক প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার বন্ধ ছিল। এ সময় তিনি চাষাবাদ করেছেন গ্রীষ্ফ্মকালীন ও মরুভূমির ফল তরমুজ ও বাঙ্গির।

 

শুধু নিজের ভাগ্যই ফেরেনি এতে; বরং আন্ধারমানিক ইউনিয়নের বেকার তরুণরাও স্বপ্ন দেখছেন নতুন করে।

 

সরেজমিন দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসান মাহমুদ সাইদের খামারে সারি সারি মাচায় ঝুলছে সৌদি আরবের সুস্বাদু ফল তিন জাতের সাম্মাম ফল যথাক্রমে রিয়া, রকমেলান ও অ্যারোশ সুইট। যেগুলো দেখতে এ দেশের বাঙ্গি জাতের ফলের মতো। এ ছাড়া দেশের তরমুজের মতো মরুভূমির ফল বেঙ্গল টাইগার, সুইট ব্ল্যাক ও কানিয়া ফলেছে তার খামারে। এগুলোর বাহ্যিক রূপ দেশি ফলের মতো হলেও স্বাদে আছে ভিন্নতা।

 

সাইদ হাসান গত বছর ২৪ শতাংশ জমিতে মরুভূমির ফল আবাদ করে বিক্রির পর আড়াই লাখ টাকা লাভ করেছেন। এ বছর এক একর জমিতে আবাদ করে ১০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। এসব ফলের বীজ বপনের ১৫ দিনের মধ্যেই ফুল ধরে এবং তিন মাসের মধ্যে ফলগুলো বিক্রয়যোগ্য হয়ে ওঠে। ১২ মাসই আবাদ করা যায় এসব ফলের।

 

এ ছাড়া তার খামারে আবাদ করা হয় বিদেশি জাতের ব্রোকলি (ফুলকপি), মিষ্টি মরিচ, লেটুস পাতা, রেডবিট (শালগম জাতীয়), টমেটো, আলুবোখারা, লবঙ্গ, ডুরিয়ান (মালয়েশিয়ান ফল) সাদা জাম, কমলাসহ দুষ্প্রাপ্য বিভিন্ন জাতের বিদেশি ফলের চারা। পাঁচটি মাছের ঘেরে আছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

 

মেঘনাবেষ্টিত উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম একটি আরেকটি থেকে নদী-খালের কারণে বিচ্ছিন্ন। মেঘনা ও কালাবদরের সংযোগ স্থাপন করা নদীটির তীরের গ্রামটির নাম আজিমপুর। খরস্রোতা নদীটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘লতা নদী’ নামে। গ্রামের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। নদীর তীরে পাঁচ একর জমিতে ২০১০ সালে কৃষি ও মাছের খামার স্থাপন করেন হাসান মাহমুদ সাইদ। আন্ধারমানিক ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মামুন সরদার বলেন, খামারটি এলাকার কৃষি ও মৎস্য চাষের জন্য রোল মডেল।

 

হাসান মাহমুদ সাইদ বলেন, গত বছর বরিশাল নগরীর একটি বীজ বিক্রির দোকানে তার পরিচয় হয় থাইল্যান্ডের চিয়াত তাই কোম্পানির (বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান) এক বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে। তার পরামর্শ ও বিনামূল্যে দেওয়া বীজে আরব দেশের সুস্বাদু ফল আবাদে আকৃষ্ট হন তিনি।

 

আজিমপুর গ্রামের আরেক স্কুলশিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, সহকর্মী হাসান মাহমুদের কৃষি ও মাছ চাষে লাভ দেখে তিনিও নিজ বাড়িতে আধা একর জমিতে খামার করেছেন। জাকির হোসেন বলেন, চাকরির আয়ের চেয়ে মাছ চাষ ও কৃষি কাজে আয় অনেক বেশি।

 

আন্ধারমানিক ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মামুন সরদার বলেন, হাসান মাহমুদের খামারে কৃষি অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের ফল ও আখ এবং নানা প্রকার সবজির প্রদর্শনী করা হচ্ছে। আগ্রহী তরুণদের নিয়ে সেখানে প্রশিক্ষণ কর্মশালা করা হয়। এরই মধ্যে আন্ধারমানিক ইউনিয়নের দুই যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে খামার গড়েছেন।

 

তাদের একজন সুলতান মো. নিপু মোল্লা বলেন, ‘সাইদ স্যার আমাদের পথপ্রদর্শক’। তিনি বলেন, তিনি এক কানি (৮০ শতাংশ) জমিতে এবার শীতকালীন সবজির পাশাপাশি সৌদির ফল আবাদ করেছেন। শীতের পরে শুধু সৌদির ফলই আবাদ করবেন তিনি।

 

আন্ধারমানিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, হাসান মাহমুদ সাইদ এলাকাতে সাড়া জাগিয়েছেন। তার দেখাদেখি অনেক শিক্ষিত তরুণ এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এতে বেকারত্ব থেকে মুক্তি ঘটছে তাদের।

 

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, অধিদপ্তরের বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসান মাহমুদের খামার পরিদর্শন করেছেন। তার উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]