বৃদ্ধার দানে দেড়শ বছর আগে গড়ে ওঠে ঝালকাঠির কারামাতিয়া মসজিদ

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত মে ৬ বৃহস্পতিবার, ২০২১, ০২:০০ অপরাহ্ণ
বৃদ্ধার দানে দেড়শ বছর আগে গড়ে ওঠে ঝালকাঠির কারামাতিয়া মসজিদ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) (জৌনপুরের পীর) বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে এসে প্রত্যন্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে বজরায় (বড় নৌকায়) সফর করতেন। সঙ্গে থাকতেন হুজুরের সফর সঙ্গীরা।

নৌকা সুবিধামতো স্থানে নোঙর করে সফর সঙ্গীদের কাঁধে ভর করে পালকিতে গ্রামে গ্রামে (যাতায়াতের অনুন্নত পথ) ইসলাম প্রচার করতেন। বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা-মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। অনেক স্থানে স্থানীয়দের দেয়া জমিতে মাদরাসা-মসজিদ স্থাপনের জন্য চিহ্ন দিয়ে তিনি শুভ সূচনাও করেন।

দেড়শতাধিক বছর আগে ঝালকাঠির রাজাপুরে সফরকালে জৌনপুরের পীর হযরত মাওলানা কারামত আলী (রহ.) উত্তর নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে একটি খোলা জায়গায় বিশ্রামের জন্য অবকাশ নেন। এ সময় স্থানীয় এলাহিন নেছা নামে এক বৃদ্ধা বোরকা পরে হুজুরের সামনে এসে দোয়া চান। জানান তিনি নিঃসন্তান, তার স্বামীও মারা গেছেন। তার কিছু জমি আছে তা আল্লাহর রাস্তায় দান করতে চান। তখন জৌনপুরী হুজুর একটি মসজিদের জন্য জমির সীমানা দিয়ে সেখানেই নামাজ আদায় করেন।

এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে মসজিদের অগ্রগতি হতে থাকে স্থানীয়দের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমেই। মসজিদের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুদক্ষ কমিটি স্থানীয় সর্বমহলে প্রশংসিত। ফলে অত্র এলাকার আশপাশে একাধিক মসজিদ থাকা সত্ত্বেও উত্তর নারিকেল বাড়িয়া কারামাতিয়া মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেশিই থাকে।

বর্তমানে মসজিদটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হলেও শুক্রবার জুমার দিনে মসজিদের মধ্যে মুসল্লিদের সংকুলান হয় না। সামনের পাকা ঈদগাহে কাপড় বিছিয়েও নামাজ পড়তে হচ্ছে মুসল্লিদের।

৯০ বছর বয়সী প্রবীণ মুসল্লি ও খাদেম আয়নাল আলী খলিফা জানান, কবে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। তবে তার দাদা-নানারাও এই মসজিদে নামাজ পড়তেন। সেই থেকে তিনি ধারণা করেন, প্রায় দুশত বছর হবে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী রহ. এ মসজিদটি নির্মাণ কাজ সূচনা করেছেন বলেও দাদার বরাত দিয়ে তিনি জানান।

মসজিদের প্রতিবেশী ৯০ বছরের বেশি বয়সী বৃদ্ধ আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের চার পুরুষ পূর্বে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। বৃদ্ধা এলাহিন নেছা হুজুরের সামনে গিয়ে দোয়া চেয়ে জমি দান করেন। সেই জমিতেই হুজুর মসজিদের চিহ্ন দেন। প্রথমে বাঁশের কোপা খুঁটি ও তালপাতার ছাউনি ছিল। তা থেকে ধীরে ধীরে টিন-কাঠ থেকে এখন টিনশেড দালান হয়েছে।’

৯৫ বছর বয়সী মুসল্লি আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা ছোট বেলা থেকেই এলাকার মধ্যে প্রথম মসজিদ হিসেবে নামাজ আদায় করছি। আমার দাদাও ছিলেন এ মসজিদের মুসল্লি। মসজিদের প্রতিষ্ঠা হিসেবে প্রায় দুই শত বছর হয়েছে বলেও ধারণা করেন তিনি।

মসজিদ কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ জানান, হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) ১৬০ বছর পূর্বে এ এলাকায় ইসলাম প্রচারে এসে মসজিদের স্থান নির্বাচন করে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শুভ সূচনা করেছেন। ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি স্থানীয়দের দান-অনুদানের ওপর নির্ভর করেই অবকাঠামোসহ সার্বিক উন্নয়ন করা হয়েছে। সরকারিভাবে তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা আসেনি বললেই চলে। সরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে মসজিদের আরও উন্নয়ন সম্ভব হতো।’

হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) এর বাংলাদেশে সফর, ইসলাম প্রচার ও প্রসারের তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরীর (রহ.) মতো বড় সুফী সাধন ব্যক্তি তখনকার সময় এই উপমহাদেশে খুব কমই ছিলেন। ১৮০১ সালে দুনিয়ার বুকে আর্বিভূত শৈশবে তার নাম কারামত আলী ছিল না। তার নাম ছিল-মুহাম্মদ আলী জৌনপুরী। কিন্তু আল্লাহর পথে ও দ্বীন ইসলামের সেবায় মানুষের খিদমতে তার বাকী জীবনে অসংখ্য অলৌকিক (কারামত) ঘটনা ঘটে। আর এই ‘অলৌকিক’ তথা কারামতের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সব মহলে। সেই থেকে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী নামে।

বাংলাদেশে ইসলামের নবজাগরণে পীর-আউলিয়া ও সূফী-দরবেশদের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি। এই পীর-আউলিয়ার অন্যতম হলেন হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.)। তিনি তার মুর্শিদ সায়্যিদ আহমদ শহিদ বেরেলভী (রহ.)-এর নির্দেশ মাথায় নিয়ে হেদায়াতের কাজে বাংলা ও আসামের পথে-প্রান্তরে সফর করনে। তিনি কলকাতা থেকে প্রথম আসেন যশোর। তারপর খুলনা এবং পুরো বাংলা। এ পুরো সফরই কাটে বজরায় (বড় নৌকা) করে।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃbarishalcrimetrace@gmail.com