বরিশালে ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি আনুর : মানবেতর জীবনযাপন

Barisal Crime Trace -GF
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৪ শুক্রবার, ২০২২, ০২:১২ পূর্বাহ্ণ
বরিশালে ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি আনুর : মানবেতর জীবনযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশকে স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেছিলেন। তবে, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও সম্মান না পাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম আনোয়ার হোসেন আনু (৮৮)।

 

তিনি বর্তমানে বরিশাল নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের লালার দিঘির পাড় সংলগ্ন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ খান’র বাড়িতে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। তার জন্ম বরিশাল নগরের দক্ষিণ আলেকান্দা এলাকায়। পিতার নাম মৃত. আবদুল খালেক খান।

 

সহায়সম্বল হারিয়ে আনু নগরের রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মধু বিক্রি করে সংসার চালান। বর্তমানে অসুস্থতার কারণে সেটিও বন্ধ।

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে সনদ। তার রয়েছে ওসমানি সার্টিফিকেটও।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে আনু ৯ নম্বর সেক্টরে কোতয়ালী কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মান্নানের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আহত হন আনু। এখনো তার ডান পায়ে লাগা সেই ক্ষত তিলে তিলে কষ্ট দিচ্ছে। সেই দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেন না আনু।

 

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ৫০ বছরেও দেশের জন্য ত্যাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি তিনি।

 

জানাতে চাইলে আনোয়ার হোসেন আনু জানান, বীর উত্তম শাহজান ওমরের নেতৃত্বেও তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বীকৃতি না পেয়ে ৮৮ বছর বয়সে এসে ভিটেবাড়ি হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এখন পর্যন্ত পাননি কোনো সরকারি সহযোগিতাও। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম যাচাই-বাছাইয়ের সময় অর্থ না দেওয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম আসেনি আনোয়ার হোসেন আনুর।

 

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে কবর খোঁড়া হয়। এ খবর আমার কাছে যখন পৌঁছায় আমি তখন দুজন পাকিস্তানি মিলিটারিকে গুলি করে হত্যা করেছি এবং তাদের বুক চিরে জনসম্মুখে রক্ত পান করেছি। এই বীরত্বের কথা সে সময় ছড়িয়ে পরে সারা দেশজুড়ে।

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরলে নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল- আনোয়ার হোসেন আনুকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করান এবং আনুর বীরত্বের কথা জানান। তখন বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র আনুর হাতে তুলে দেন। সে সময় আনুকে দুই হাজার টাকা দিয়ে পুরস্কৃত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

এই তথ্যের সত্যতা জানিয়ে আনুর সহযোদ্ধা, বরিশাল মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য, নৌ-কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল বাশার বলেন, ‘এর মধ্যে আমি একদিন নগরের রূপাতলী যাওয়ার পথে দেখি আনু মধু বিক্রি করে। তখন আমি খুব দুঃখ পাই। কিন্তু কারও কাছে প্রকাশ করিনি। আমার সহযোদ্ধাকে দেখে সেদিন আমি আমার চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। আমি চাই আনুকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে কলঙ্কের দাগ মুছে দেওয়া হোক।

 

সৈয়দ আবুল বাশার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনু আজ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি না পেয়ে অবহেলিত। আমি আনুর সহযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তিনি যুদ্ধ করেছেন কোতোয়ালির কমান্ডারের নেতৃত্বে। আমার জানা মতে আনু একজন তুখোড়, পাগলাটে এবং নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

 

আনুর বড় ছেলে হাসান বলেন, ছোট বেলা থেকে বাবার মুখে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনেছি। সর্বশেষ সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাছাইয়ের তালিকা করে তখন বাবা বলেছিল আমার কাগজপত্র জমা দিয়েছি এবার বুঝি তোদের দুঃখ কষ্ট ঘুচবে। পাব মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। তোরা পাবি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের সম্মান। তবে বাছাই তালিকার দায়িত্বরতদের আর্থিক চাহিদা পূরণ করতে না পারায় সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আসেনি বাবার নামটি।

 

এমন কথা বলে অঝোরে কেঁদে বঙ্গবন্ধু’র কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। মৃত্যুর আগে বাবাকে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকায় দেখতে চান আনুর সন্তানরা।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]