রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ কত জানে না সরকার!

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত মে ১৭ সোমবার, ২০২১, ০৩:৩৩ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ কত জানে না সরকার!

বরিশালক্রাইমট্রেস ডেস্কঃ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য যে পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ হচ্ছে, তা থেকে কী পরিমাণ অর্থ রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ করা হয় তার সঠিক তথ্য জানে না বাংলাদেশ সরকার। 

২০১৭ সাল থেকে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) নামে রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজটি করে আসছে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপ। আর সবকিছু দেখভালের দায়িত্বে মূলত থাকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের পেছনে বাৎসরিক খরচের পরিমাণ জানতে চাওয়া হলে এই সংস্থাটি স্পষ্ট কোনো বার্তা দিচ্ছে না। এই তহবিলের অর্থ সংস্থার কর্মকর্তাদের পেছনে খরচ করা হয় বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহে যে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) বা দাতাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ তহবিল পাওয়া যাচ্ছে তার পরিমাণ জানা থাকলেও রোহিঙ্গাদের জন্য বছরে কত টাকা খরচ হয়, তার সঠিক হিসাব জাতিসংঘ বা ইউএনএইচসিআর থেকে পায় না সরকার।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য এ বছর ৯৪ কোটি ডলার তুলতে চায় জাতিসংঘ। মঙ্গলবার (১৮ মে) দাতাদের বৈঠকে নতুন এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এ বছর কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের জন্যও তহবিল বরাদ্দ রাখার বিষয়ে জাতিসংঘকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এ বছর রোহিঙ্গাদের জন্য যে তহবিল চাওয়া হচ্ছে দাতাদের কাছে সেখানে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য যে টাকা দরকার জাতিসংঘ সেটা তুলে ধরবে, এটা রুটিন ম্যাটার। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বলেছে, তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। আমি সম্প্রতি বলেছিলাম, এক লাখ রোহিঙ্গা যদি ভাসানচরে যায় তাদের জন্যও যেন সেই তহবিলে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন 

রোহিঙ্গাদের পেছনে বাৎসরিক অর্থায়নের হিসাব সরকারের কাছে আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য যে টাকা আসে, তা থেকে বাংলাদেশ সরকার এক টাকাও পায় না। এটা ইউএনএইচসিআরকে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার জন্য। আমরা জানি না কীভাবে খরচ হয়, কত খরচ হয়। আমরা জানি না, তারা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করে না। আমাদের জানার অধিকার আছে। আমরা সরকার হিসেবে বললেও তারা কখনও প্রকাশ করে না। টাকাটা বাংলাদেশের নামে রোহিঙ্গাদের জন্য আসছে, তবে আমরা এক পয়সাও টাচ করিনি।’

রোহিঙ্গাদের জন্য আসা তহবিল থেকে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো ব্যক্তিগত কাজে অর্থ খরচ করে বলেও অভিযোগ করেন মোমেন। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের সব লোকজন টাকাটা খরচ করে। টাকাটা কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য আসে, ইউএনএইচসিআরের জন্য নয়; ইউএন অফিশিয়ালদের জন্য নয়। কিন্তু তারা তাদের জন্য ব্যবহার করে আর কিছু টাকা রোহিঙ্গাদের জন্য খরচ করে।’

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের কারণে নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। সে সময় থেকে তাদের দেখভালের জন্য জেআরপি নামে রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করা হয়।

রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচের তথ্য নিয়ে সরকারের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতিসংঘের ঢাকা অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সরকারের এই অভিযোগ সঠিক নয়। বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিভিন্ন এনজিও অংশীদাররা মিলে রোহিঙ্গাদের চাহিদা পূরণ করছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে সঙ্গে রেখেই সব কিছু করছে।’

শুক্রবার (১৪ মে) ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র অ্যানড্রেজ মাহেকিক জেনেভায় এ বছরের জেআরপি প্রসঙ্গে জানান, দাতাদের বৈঠকে শরণার্থীদের জন্য ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের একটি নতুন যৌথ সহায়তা পরিকল্পনা নিচ্ছে তারা।

রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানো কত দূর 
প্রায় চার বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ফেরত পাঠানোর বিষয়কে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়ে দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা বলছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। কিন্তু এখনও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করা যায়নি। এরইমধ্যে লাখখানেক রোহিঙ্গাকে পর্যায়ক্রমে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

ইউএনএইচসিআর জানায়, বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের ১৩৪টি সংস্থা এবং এনজিও অংশীদাররা মিলে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী এক বছরের জন্য সেই খরচ যোগানোর পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে ২০২১ সালের এই জেআরপিতে।

এই পরিকল্পনায় কক্সবাজার জেলায় আট লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা চার লাখ ৭২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যও সহায়তার কথা বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের চাহিদা পূরণের জন্য ২০২০ সালের জেআরপিতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি তহবিল চেয়েছিল জাতিসংঘ। শেষ পর্যন্ত এই আবেদনের মাত্র ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ পূরণ হয়।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। আগে থেকেই দেশে আরও চার লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছিলেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে বাংলাদেশে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]