বরিশালের সড়ক-মহাসড়ক স্পিড ব্রেকারের দখলে! দুর্ঘটনার আশঙ্কা কয়েকগুণ

Barisal Crime Trace
প্রকাশিত মে ২৪ সোমবার, ২০২১, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
বরিশালের সড়ক-মহাসড়ক স্পিড ব্রেকারের দখলে! দুর্ঘটনার আশঙ্কা কয়েকগুণ

বরিশালক্রাইমট্রেস ডেস্কঃ বরিশাল মহানগর থেকে ঝালকাঠী জেলা শহরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এ পথ পেরোতে ২৭টি স্পিড ব্রেকার টপকাতে হয় প্রতিটি গাড়িকে। শুধু এ সড়কটি-ই নয়, বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব সড়ক-মহাসড়কই এভাবে অপরিকল্পিত আর অবৈধ স্পিড ব্রেকারের দখলে চলে গেছে। বিপুলসংখ্যক স্পিড ব্রেকার কীভাবে বসল তার কোনো ধারণা নেই খোদ সড়ক বিভাগেরও।

তারা বলছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপে এগুলো বসানো হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা প্রায় অসহায়। অথচ সড়ক-মহাসড়কে এভাবে স্পিড ব্রেকার দেয়ার বিধান নেই। দিকনির্দেশক চিহ্ন এবং পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিংয়ের বাইরে এসব সড়কে থাকতে পারে শুধু র‌্যাম্বেল স্ট্রেট (আধা ইঞ্চি উঁচু বিট একসঙ্গে ৬ থেকে ৮টি)। অথচ বিপজ্জনক স্পিড ব্রেকারগুলো বসিয়ে শুধু গাড়ির ক্ষতিই করা হচ্ছে না, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে কয়েকগুণ।

কথা হচ্ছিল বরিশাল সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা তারেক ইকবালের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘সড়কে মসৃণ গতিতে চলবে যানবাহন। এটাই মূলত সড়ক ও সেতু বিভাগের নীতি। সড়ক বিধিতে স্পিড ব্রেকার বলে কিছু নেই। উন্নত দেশগুলোতেও একই নিয়ম বিদ্যমান। তারপরও আমাদের দেশের বাস্তবতায় এটা পুরোপুরি পালন করা সম্ভব হয় না। কিছু স্পিড ব্রেকার আমাদের দিতে হয় এটা সত্যি, কিন্তু যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তার বাইরে চাপের মুখে বা আমাদের অজান্তে বসানো হয় স্পিড ব্রেকার। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়ে যেমন ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা সড়কে স্পিড ব্রেকার বা জেব্রা ক্রসিং দেয়ার বিধান নেই। এছাড়া আন্তঃজেলা সড়ক কিংবা মহাসড়কগুলোতেও একেবারে জরুরি না হলে দেয়া যাবে না কোনো স্পিড ব্রেকার। যদি দিতেই হয় সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক চিঠি দেন সড়ক বিভাগকে। যাচাই করে সেখানে স্পিড ব্রেকার বসানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বরিশালের ক্ষেত্রে এসব বিধিবিধানের কোনোটিই পালিত হচ্ছে না। বলতে দ্বিধা নেই একমাত্র বরিশালেই এমনটা দেখলাম। যে যার মতো করে স্পিড ব্রেকার বসাচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে যাতায়াতে এটা যে কতটা ক্ষতিকর তা কেউ বিবেচনা করে দেখছে না।’

সূত্র বলছে, বরিশাল নগরীসংলগ্ন কাশিপুর এলাকার ওপর দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। এ মহাসড়কের কাশিপুর অংশেই ২ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ১০টি স্পিড ব্রেকার। বরিশাল বিমানবন্দর থেকে বরিশাল পটুয়াখালীর সীমান্ত লেবুখালী ফেরিঘাট পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ২৫ কিলোমিটার পথে স্পিড ব্রেকার রয়েছে ৪২টি। বরিশাল থেকে পাথরঘাটা পর্যন্ত ১১২ কিলোমিটার সড়কে স্পিড ব্রেকার রয়েছে ১৪৬টি। এমনও দেখা গেছে যে সড়কের পাশে ৫-৭টি দোকান থাকলেই তার দুপ্রান্তে বসিয়ে দেয়া হয়েছে দুটি স্পিড ব্রেকার। কোথাও কোথাও প্রভাবশালী কারো বাড়িতে ঢোকার শাখা সড়ক কিংবা বিত্তশালী শিল্প মালিকের কারখানার সামনেও তৈরি করে রাখা হয়েছে জোড়ায় জোড়ায় গতিরোধক। যেমনটা দেখা গেছে বরিশাল নগরসংলগ্ন কাশিপুর এলাকায়। অবস্থাটা এমন যার যেখানে ইচ্ছে হয়েছে সেখানেই যেন বসেছে স্পিড ব্রেকার। ঝালকাঠী-রাজাপুর সড়কে স্রেফ একটি বাড়ির জন্য ২টি স্পিড ব্রেকার বসানোর চিত্রও দেখা গেছে।

বরিশাল-পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি কাওসার হোসেন শিপন বলেন, ‘বরিশাল থেকে ঝালকাঠীর দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। এটুকু সড়কে যদি ২৬-২৭টি স্পিড ব্রেকার থাকে তাহলে আপনিই বলুন যে একজন ড্রাইভার কি করে গাড়ি চালাবেন? এমনতিই আমাদের দেশের স্পিড ব্রেকারগুলো কোনো নিয়ম-কানুন মেনে তৈরি হয় না। কোথাও আবার কবরের মতো উঁচু করে বানানো হয়েছে স্পিড ব্রেকার। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, এসব গতিরোধকের আগে-পরে কোনো সতর্ক সংকেত থাকে না। অধিকাংশ স্পিড ব্রেকারে কোনো রং-ও দেয়া থাকে না। ফলে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। রাতে কিংবা বরিশালের বাইরে থেকে আসা গাড়িগুলো প্রায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বাইক চালকরা। এসব স্পিড ব্রেকারের বেশি উঁচু-নিচু হওয়ায় গাড়িরও অনেক ক্ষতি হয়। মাস দুই মাস পরেই পাল্টাতে হয় যন্ত্রাংশ।’

পটুয়াখালী সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান খান বলেন, ‘অনেক সময় স্থানীয়দের চাপে অনেক অপ্রয়োজনীয় স্পিড ব্রেকার বসাতে বাধ্য হই আমরা। দেখা গেল দুর্ঘটনায় কেউ আহত-নিহত হলেন অমনি দাবি উঠে গতিরোধক নির্মাণের। আন্দোলন পর্যন্তও হয়েছে নেমে যায় মানুষ। তখন বাধ্য হয়ে স্পিড ব্রেকার দিতে হয়।’ পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ঝালকাঠীর একজন ঠিকাদার বলেন, ‘শিডিউলে না থাকলেও নির্মাণ কিংবা সংস্কার কাজ করার সময় রাস্তার আশপাশে থাকা জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালীদের চাপে অনেকটা বাধ্য হয়েই স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করে দিতে হয় আমাদের।

বরিশাল নাগরিক পরিষদের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, বরিশাল নগরসংলগ্ন সিএন্ডবি সড়ক যেটি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। এ সড়কের পাশে টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট। সেখানে একবার সড়ক পার হতে গিয়ে একজন দুর্ঘটনায় নিহত হলেন। শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর দাবির মুখে সেখানে দেয়া হলো একজোড়া স্পিড ব্রেকার। এবার স্পিড ব্রেকারে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেলেন একজন শিক্ষিকা। আসলে স্পিড ব্রেকার কোনো সমাধান নয়। সবার আগে দরকার সচেতনতা। স্পিড ব্রেকার না থাকলে যেমন মানুষ দুর্ঘটনা কবলিত হয় তেমনি স্পিড ব্রেকার দিলেও ঘটে দুর্ঘটনা। সড়ক থেকে স্পিড ব্রেকার সরাতে হবে। এটা এখন জরুরি।




আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বরিশাল ক্রাইম ট্রেস”কে জানাতে।
ই-মেইল করুনঃ[email protected]