নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালে দক্ষিণ আমেরিকার ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন ‘ড্রাগন ফলের’ আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এ ফলের বাজারও ইতোমধ্যে যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছে। সারা দেশের মতো বরিশালেও গত কয়েক বছরে ড্রাগনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ডিম্বাকৃতির এ ফলের পৃষ্ঠদেশ অনেকটা রূপকথার ড্রাগনের মতো বলে এদেশে নাম হয়েছে ‘ড্রাগন ফল’।

 

 

 

কেউ বলেন ‘রেডপিটায়া’, অনেকে বলেন ‘স্ট্রবেরি পিয়ার’। ভিনদেশী এ ফলকে কেউ কেউ ‘কনডেরেলা’ বলেও ডাকেন। পাকা এ ফল সরাসরি এবং শরবত ছাড়াও জুস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি ও আইসক্রিমের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। মৌসুমের শুরুতে ৪০০ টাকা কেজির ড্রাগন ভরা মৌসুমে ১২০ টাকা থেকে মানভেদে দেড়শ টাকা কেজিতেও বিক্রি হচ্ছে।

 

 

 

প্রতি বছরই ড্রাগন ফলের আবাদি এলাকা বাড়ছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)-র দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। চলতি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় ৫০০ একরে ড্রাগনের আবাদ হয়েছে বলে জানা গেছে। এবার জাতভেদে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে ড্রাগনের উৎপাদন হেক্টরে ৪০-৬০ টন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রতিবেশী ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং অস্ট্রেলিয়া পেরিয়ে সুদূর আমেরিকা ও মেক্সিকোসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা জাতের ড্রাগনের আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে।

 

 

 

তবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ড্রাগনের ভেতরের অংশ সাদা। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব জাতের ড্রাগন আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে, তার ভেতরের অংশটি লাল এবং তুলনামূলকভাবে সুমিষ্ট; যা সহজেই সবার চোখ জুড়ায়।

 

 

 

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েকটি জাতের উন্নত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ উচ্চ ফলনশীল ড্রাগনের জাত উদ্ভাবন করে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদনকারীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। এসব জাতের মধ্যে ‘বারি ড্রাগন ফল-১’ ছাড়াও সাদা শাঁসের ‘বাউ ড্রাগন ফল-১’ এবং লাল শাঁসের ‘বাউ ড্রাগন ফল-২’ ও ‘বাউ ড্রাগন ফল-৩’ রয়েছে।

 

 

 

ফুল ও স্ব-পরাগায়িত ড্রাগন ফলের ভেষজ গুণও অপরিসীম বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত হয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধী ড্রাগন ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর। এ ছাড়া নিয়মিত ড্রাগন ফল খেলে হৃদরোগ প্রতিরোধ, হাড় মজবুত, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণসহ স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমিয়ে আনা সম্ভব বলে ভেষজবিদগণ উল্লেখ করেছেন। মানসিক ও হাঁপানির মতো জটিল রোগ সারাতেও ড্রাগন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

 

 

 

এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা দূর করা, কিডনিতে পাথর জমতে বাধা দেওয়া, মুখের ব্রণ ও শরীরে মেদ কমাতে সহায়তা করা সহ দাঁতের স্বাস্থ্যকে সংহত রাখে ড্রাগন ফল। এমনকি চুল পড়া প্রতিরোধসহ মুখের লাবণ্যতা বৃদ্ধিতেও ড্রাগন অত্যন্ত কার্যকরী বলে জানা গেছে।

 

 

 

পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগনে ১৪ গ্রাম শর্করা, ০.৫ গ্রাম প্রোটিন, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৫ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৭ মিলিগ্রাম আয়রন, ১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন-এ, ০.৪৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২, ০.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৩, ২৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি ছাড়াও খাদ্যশক্তি আছে ৫০ কিলোক্যালরি। এ ছাড়াও ড্রাগন ফলে আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লাইকোপিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এমনকি ড্রাগন ফলের বীজে ফ্যাটি এসিড ওমেগা-থ্রি ও ওমেগা-নাইন রয়েছে।

 

 

 

বীজ এবং অঙ্গজ উপায়ে ড্রাগনের চারা তৈরি করা যায় বলে কৃষিবিদগণ জানিয়েছেন। তবে বীজের মাধ্যমে তৈরি চারা থেকে গাছে ফল ধরতে কিছুটা বিলম্ব ঘটে। সেজন্য কাটিং-এর মাধ্যমে বংশ বিস্তারকেই উপযোগী বলে মনে করেন কৃষিবিদগণ।

 

 

 

কাটিং পদ্ধতির চারায় দেড় বছরের মধ্যেই ফল ধরে। তবে ড্রাগন গাছ রোপণের আগে মাদা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি মাদার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা দুই ফুট করে হতে হবে। একটি মাদা থেকে আরেকটির দূরত্ব কমপক্ষে আড়াই মিটার বা প্রায় ১০ ফুট রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন কৃষিবিদগণ।

 

 

 

চারা রোপণের ১৫ দিন আগে প্রতিটি গর্তে ২০ কেজি গোবর সার ছাড়াও ২৫০ গ্রাম করে টিএসপি এবং এমওপি, ১০০ গ্রাম জিপসাম, ১৫ গ্রাম জিংক ও ২৫ গ্রাম বরিক এসিড মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভর্তি করে মাদা প্রস্তুত করতে হবে। এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে মাদা তৈরি করে সিমেন্টের খুঁটি বসিয়ে দিতে হবে গাছের ওজন ধরে রাখার জন্য। খুঁটির চারদিকে ৪টি চারা রোপণ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি বছরই সুষ্ঠু সার ও বালাই ব্যবস্থাপনার দিকে নজরদারি করারও পরামর্শ দিয়েছেন ডিএই-র কৃষিবিদগণ।

 

 

 

সঠিক বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষিবিদদের নিয়মিত পরামর্শ গ্রহণেরও তাগিদ দেওয়া হয়েছে ভিনদেশী এ ফলের জন্য। ডিএই-র হর্টিকালচার বিভাগের পরিচালকের মতে, দেশে প্রতি বছরই ড্রাগনের আবাদ বাড়ছে।

 

 

 

সরকারি নার্সারিগুলোতে প্রতি বছরই ড্রাগন ফলের চারা উৎপাদনের সাথে বিক্রিও বাড়ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশে ড্রাগনের আবাদ ১০ হাজার একর অতিক্রম করেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা তা ২৫ হাজার একরে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। সঠিক পরিচর্যা এবং সার ও বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে হেক্টর প্রতি ৪০-৬০ টন পর্যন্ত ড্রাগন উৎপাদন সম্ভব বলেও জানান তিনি।