নিজস্ব প্রতিবেদক : বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) সূর্যোদয়ের পর পরই বহু প্রতীক্ষিত একটি সুষ্ঠু, আবাধ ও গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের দোড় গোড়ায় বরিশালবাসী। বরিশাল অঞ্চলের ২১টি আসনে একটি নিরপেক্ষ ভোট সম্পন্নের লক্ষ্যে এবার প্রায় ৫৫ হাজার ভোটকর্মী ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য ভোট কেন্দ্রে থাকছে। এর বাইরে সেনাবাহিনী, র্যাব, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি এবং ব্যটেলিয়ন আনসারের মজুদ ফোর্স ও টহল দলও সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ শুরু করেছেন দুদিন আগেই।
নিরাপত্তার চাঁদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে পরো এলাকা। নিয়ম মেনে ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগেই সব ধরনের প্রচারণা বন্ধের পরে বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালেই ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে। টানা ১৫ দিনের প্রচারণার পরে বুধবারের বরিশালে ছিল শুনশান নিরবতা। যা অনেকের কাছে মাঝে মাঝে অস্বস্তিও তৈরি করে।
ADVERTISEMENT
এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ২১ আসনে ৭৯ লাখ ৮১ হাজার ১০৪ ভোটারের ৩৯ লাখ ২৬ হাজার ৯১৯ জন নারী। এবারই ৭৮ জন হিজড়া ভোটারও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ২০০৮’র পরে এবারই অন্তত ২০ লাখ তরুণ ভোটার ভোট দেয়ার অপেক্ষায় আছে। আজকের ভোটে এসব তরুণ ভোটাররাই আগামী সরকার গঠনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেব বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
বৃহস্পতিবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১ আসনে স্বতন্ত্র ১১ জন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১১৩ জন প্রার্থী নির্বাচনি প্রতিদন্ধীতায় থাকলেও এর অর্ধেক প্রার্থীকেও স্ব স্ব নির্বাচনি এলাকায় কখনো দেখা যায়নি।
বুধবার দুপুরের মধ্যেই বেশিরভাগ ভোট কেন্দ্রে ব্যালট পেপার সহ ভোট বাক্স পৌঁছে গেছে। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারগণ ছাড়াও আনসার ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও স্ব স্ব কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ২,৮৩৮টি ভোট কেন্দ্রের ১৭, ৩৯৬টি কক্ষে ভোটারগন ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের প্রায় সোয়া ৬শ ভোট কেন্দ্রকে স্পর্শকাতর বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। স্পর্শকাতর ভোটকেন্দ্র গুলোতে অতিরিক্ত একজন অস্ত্রধারী পুলিশ থাকছে। এর বাইরে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে আরো ৩জন সশস্ত্র এবং একাধিক নিরস্ত্র আনসারও থাকছে।
পুলিশের বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারের মতে, কিছু ভোট কেন্দ্রকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে সেখানের আইন-শৃংখলা সহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রসহ অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। বরিশাল মহানগর এলাকার কেন্দ্রগুলোতে মোতায়েন পুলিশ সদস্যদের বডি অন ক্যামেরা দেয়া হচ্ছে। এসব ক্যামেরা সরাসরি বিএমপি সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সংযুক্ত থাকছে। ফলে কারোপক্ষে কোনো ধরনের আইনের ব্যত্যয় ঘটানো সম্ভব হবেনা বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। পাশাপাশি বরিশালের প্রায়সব ভোট কেন্দ্রে এাবার সিসি ক্যমেরা বসান হয়েছে।
বুধবার বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে নির্বাচনকালীন ডিউটিতে মোতায়েনকৃত পুলিশ সদস্যদের ব্রিফিং প্যরেড অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম উপস্থিত সব পুলিশ সদস্যকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ,সততা ও আন্তরকিতার সাথে দায়িত্ব পালনে সতর্ক করে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের এ নির্বাচনে এখনো সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করলেও কিছু কিছু প্রার্থী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন। বরিশাল-৪ আসনে জামায়াত ইসলামী প্রার্থী মেহেদিগঞ্জের আন্ধারমানিক এলাকায় তার নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা সহ গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ এনে বুধবার বরিশাল প্রেসক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি ‘অবিলম্বে দোষীদের গ্রেপ্তার সহ নির্বাচনি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবী জানিয়েছেন।
তবে ঐ আসনে বিএনপি প্রার্থী রাজীব অঅহসানও বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তার র্বিাচনী এরঅকায় বিপুলসংখ্যক বহিরাগত জামাত কর্মীর উপস্থিতি ভোটারদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করেছে বরে অভিযোগ করেছেন। বরিশাল-৩ আসনের ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদও তার এলাকায় বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি ও জাল টাকার ছড়াছড়ির অভিযোগ করেছেন। এমনকি বুধবার মাধবপাশায় তার নির্বাচনি অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন ফুয়াদ।
বরিশাল-৫, বিভাগীয় সদর আসনে বিএনপি প্রার্থী মুজিবুর রহমান সারোয়ার ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রয়েছে বলে মন্তব্য করে সবাইকে ভোট কেন্দ্রে যাবার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ অতীতের মত এবারো জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে থাকবে বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে এ আসনে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি আন্দোলনের শায়খ সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম ‘এখনো নির্বাচনি পরিবেশ বজায় আছে বলে জানিয়ে ভোট গ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণা না হওয়ায় পর্যন্ত এ বিষয়ে বেশী কিছু বলা যাবেনা’ বলেও মন্তব্য করেছেন। বুধবার বরিশাল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে, জামায়াতে ইসলামি তার পক্ষে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলেও তারা মাঠে নেই কেন, জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তারা কাকে ভোট দেবে ? আমরা ছাড়া তো আর ইসলামী দল নেই।’
কেন ১২ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ঘোষনাপত্রে তো ইসলাম নেই, তাই তাদের সাথে থাকা সম্ভব হয়নি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে প্রথমদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জনমনেও কিছুটা দ্বিধা ও সন্দেহ-সংশয় থাকলেও ভোটের প্রচারণার জোয়ারে ইতোমধ্যে সব অপপ্রচার ভেসে গেছে। সারা দেশের মত সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল এখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষন গণনা করছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ এলাকার ভোটারদের কাছে কেন্দ্রের নাম ও ভোটার নম্বর পৌঁছে দিয়েছেন প্রার্থীদের কর্মীগন। বেশিরভাগ মানুষই বৃহস্পতিবার ভোট দেয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। সরকারি ছুটির সুযোগে এবার ভোট দিতে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশ থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে ছুটে এসছেন। বরিশাল মহানগরী থেকেও বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ গ্রামেগঞ্জে ছুটে গেছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।
মঙ্গলবার থেকেই সশস্ত্র বাহিনী সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে নিরাপত্তার চাঁদরে মুড়ে ফেলেছেন। প্রতিটি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক সহ গুরুত্বপূর্ণস্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব সহ বিভিন্ন বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারীও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সব অপপ্রচার আর দ্বিধা সংশয় কাটিয়ে বহুল আলোচিত ও বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার অপেক্ষায় বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।