আন্তর্জাতিক ডেস্ক : একদিকে  চলছে ইসরাইল, ইরান, ফিলিস্তিন, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ভারী হয়ে আছে বারুদের গন্ধে। অন্যদিকে জনমনে মৃত্যুর আতঙ্ক। এরই মাঝে মস্কোতে ২৬ মার্চের সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিন যে সতর্কবার্তা দিলেন, সেটি সরাসরি শুনলে মনে হয় সাধারণ উদ্বেগ। কিন্তু আসলে এই বক্তব্য অনেক বেশি হিসেবি, অনেক বেশি রাজনৈতিক।

পুতিন বললেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে করোনা মহামারীর মতো ধাক্কা দিতে পারে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকগণ বলছেন, এই তুলনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু ক্ষতি বোঝাতে চাননি, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন—এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এর প্রভাব সাপ্লাই চেইন, জ্বালানি বাজার, এমনকি রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ অপারেশনে এ পর্যন্ত ইরানের অন্তত ২৬টি প্রদেশে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক কমান্ড কাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু এই হামলার মধ্যেও একটি জিনিস স্পষ্ট—এটি দ্রুত শেষ করার যুদ্ধ নয়। বরং ধাপে ধাপে ইরানকে দুর্বল করার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। কিন্তু ইরানও একের পর এক সামনে আনছে বিধ্বংসী সব ক্ষেপণাস্ত্র।

ইরান সরাসরি বড় আঘাত না করে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করছে। পুতিন জানেন, এই রুট অস্থির হয়ে গেলে যুদ্ধ শুধু সামরিক থাকে না; এটি সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। আর এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তেলের দাম তত বাড়বে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের যে সকল দেশ ইতোমধ্যেই রাশিয়ার গ্যাসের ক্রেতা হিসেবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন, তারা আবারও জ্বালানি সংকটে পড়বে। অর্থাৎ, পুতিন সরাসরি কিছু না বললেও তিনি আসলে পশ্চিমকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন,যুদ্ধ চালিয়ে গেলে এর খরচ তাদেরকেই দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌশলগত কারণে পুতিন কোথাও সরাসরি ইরানের পক্ষে কথা বলেননি। কিন্তু তিনি পুরো আলোচনাকে অর্থনীতি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার দিকে টেনে নিয়েছেন। এটি রাশিয়ার কৌশল—নিজেকে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে, কিন্তু পরিস্থিতিকে এমনভাবে ফ্রেম করা যাতে পশ্চিমা ব্লক চাপের মধ্যে পড়ে।

এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও দ্বৈত। একদিকে তারা ইরানকে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে হাজার হাজার টার্গেটে হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দিচ্ছে। এর মানে—ওয়াশিংটন যুদ্ধ থামাতে চায়, কিন্তু নিজেদের দেওয়া শর্তের সাপেক্ষে।

ইসরাইল ইরানকে শুধু সামরিকভাবে দুর্বল করতে চাইছে না, বরং ইরানের হুমকি পুরোপুরি শেষ করাই নেতা নিয়াহুর লক্ষ্য। আর এই জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, এর মানে—এই যুদ্ধ দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনুমান, যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দুই কৌশলে এগোচ্ছে। একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে ধারাবাহিক সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন আসলে যুদ্ধ থামাতে চায়, কিন্তু এমন এক অবস্থায়—যেখানে ইরান আর পূর্বের মতো শক্তি নিয়ে টেবিলে বসতে না পারে।

ইসরাইলের অবস্থান এখানে আরও সরাসরি এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের কৌশল ডিটারেন্স নয়, বরং এলিমিনেশন। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সব হুমকি এখনই শেষ করে দিতে চায় তারা। এই ধরনের লক্ষ্য সাধারণত স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধ দিয়ে অর্জন করা যায় না; এটি সময় নেয়, এবং সেই সময়টাই পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়।

পুতিনের বক্তব্যকে ঘিরে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ এখন শুধু ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন এক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে জ্বালানি, অর্থনীতি আর ভূরাজনীতি একসাথে জড়িয়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিনের কথার আসল অর্থটা এখানেই—যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এটি তত বেশি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তখন আর কেউ জিততে পারবে না, কিন্তু সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।