তরিকুল ইসলাম, ভা-ারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধিঃ পিরোজপুরের ভা-ারিয়ায় জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার গ্রিড স্টেশন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত স্থানীয় জনগণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেও প্রতিদিন দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও কৃষকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে এই গ্রিড স্টেশন থেকে পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, কাউখালী, কাঠালিয়, পাথরঘাটা সহ আশপাশের অন্তত ১০টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, সেখানে ভা-ারিয়াবাসীকেই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অফিসসূত্রে জানা গেছে, ভা-ারিয়া উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র দেড় থেকে ২ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকেল ও রাত মিলিয়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলায় বর্তমানে পিডিবি ও পল্লি বিদ্যুৎ এই দুই ধরনের সংযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভা-ারিয়া পৌর বাজার ও পৌর এলাকার গ্রাহকরা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর আওতায় বিদ্যুৎ সুবিধা পেলেও উপজেলার বাকি বিস্তীর্ণ এলাকা পল্লি বিদ্যুতের অধীন রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওজোপাডিকো এলাকায় দিনে রাতে ৮ থেকে ১০ বার, কখনও তারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। অন্যদিকে পল্লি বিদ্যুতের গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরও বেশি। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, রাত এমনকি গভীর রাতেও দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলতে থাকায় জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন হোসেন বলেন, প্রতিদিনই সাত আটবার বিদ্যুৎ চলে যায়। তীব্র গরমে ঘরে থাকা যায় না, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে খুব কষ্ট হয়। পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে, রাতে ঠিকভাবে ঘুমানোও সম্ভব হয় না। পুরো পরিবারই চরম ভোগান্তিতে আছে।

উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী মো. জাহিদ খান বলেন, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে দোকানের লাইট, ফ্যান বন্ধ হয়ে যায় । ক্রেতারাও দোকানে আসতে আগ্রহ হারায়। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা চালানো এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কলেজ শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার জানান, বর্তমানে পরীক্ষার সময় চলায় নিয়মিত পড়াশোনা করা জরুরি। কিন্তু রাতে পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। তীব্র গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।

ভা-ারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির মোটর বন্ধ, দোকানে অন্ধকার এবং গরমে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। রাতে লোডশেডিং বেড়ে গেলে ঘুমানোও কষ্টকর হয়ে পড়ে।

এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি অবৈধভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড বা সরাসরি সংযোগ লাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। এতে সাধারণ গ্রাহকরা নির্ধারিত বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বেশ কিছু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, চলতি মাসসহ ভা-ারিয়া এলাকায় বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। বকেয়া বিল আদায়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং কিছু গ্রাহকের অনাদায়ের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নিয়মিত বিল পরিশোধকারীরাও লোডশেডিংয়ের শিকার হওয়ায় অসন্তোষ বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল কবির বলেন, যে এলাকায় গ্রিড আছে, সেই এলাকাতেই যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে গ্রিড থাকার লাভ কী? আমরা শুধু নামেই সুবিধাভোগী।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান, রাইস মিল, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, ফটোকপি দোকান, ইন্টারনেট ব্যবসা ও ফ্রিজিং ব্যবসাসহ নানা খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আয় কমছে এবং লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।

সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, ভা-ারিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান জরুরি। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বৃদ্ধি, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বকেয়া বিল আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং লোড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ ফিরোজ হোসেন সন্যামত বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপের কারণে ভা-ারিয়াতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হচ্ছে। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে এবং সরবরাহ বাড়লে ভা-ারিয়ার সমস্যাও কমে আসবে।