নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনার নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠীসহ বিষখালী নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় অবৈধ কয়লা চুল্লির বিস্তার এখন জনজীবন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘এ যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এক নীরব বিষ।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর তীর ঘেঁষে সারি সারি কয়লা চুল্লি দিন-রাত জ্বলছে। এসব চুল্লি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা প্রায় স্থায়ীভাবে আচ্ছন্ন থাকে। ফলে বাতাসের মান মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটছে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকের মতে, বসবাসের পরিবেশ দ্রুতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নলটোনা ও পাথরঘাটা উপজেলাসহ বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বর্তমানে ২০টির বেশি কয়লা চুল্লি সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে আজগরকাঠী এলাকাতেই সম্প্রতি নতুন করে বেশ কয়েকটি চুল্লি স্থাপিত হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একাধিক চুল্লি ভেঙে ফেলা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় কার্যক্রম শুরু হয়। উচ্ছেদ অভিযানগুলো কতটা টেকসই? জনমনে এপ্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এসব কয়লা চুল্লি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, অ্যাজমা, ফুসফুসের রোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
চুল্লিগুলোর প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় জীবিকাতেও পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। জেলেরা জানিয়েছেন, নদীর পানি দূষিত হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ধোঁয়ার কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং ফলনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতে করে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ছে অনেকের জন্য।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে বা প্রতিবাদ করলে অনেক সময় সামাজিক চাপ কিংবা হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেকেই নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক।
নলটোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সফিকুজ্জামান মাহফুজ বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ একটি চক্র আমাকে জড়িয়ে যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
সচেতন মহলের মতে, এই সমস্যা সমাধানে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত এসব অবৈধ কয়লা চুল্লি স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। নইলে বরগুনার এই জনপদ এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের দিকে এগিয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা এখন ক্রমেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।