নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল শুধু ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই উপকূলীয় অঞ্চল। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও উপকূল নিয়ে সমন্বিত ও বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্যোগ, ভাঙন, লবণাক্ততা, পানি সংকট ও জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে উপকূলের মানুষ।

সরকারি ও গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩২ শতাংশ এলাকা উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে বসবাস করে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। দেশের সামুদ্রিক মৎস্য, চিংড়ি শিল্প, লবণ উৎপাদন, সমুদ্রবন্দর, পর্যটন ও ব্লু ইকোনমির বড় অংশ নির্ভর করছে উপকূলের ওপর। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও বহন করছে এই অঞ্চল।

২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান এবং ২০২২ সালের সিত্রাংসহ একের পর এক দুর্যোগে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, কৃষিজমি নষ্ট হওয়া ও জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধি এখন নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে উপকূলীয় এলাকার সমস্যা নিয়ে পানি সম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দপ্তর কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পৃথক ‘উপকূলীয় মন্ত্রণালয়’ গঠন করা হলে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে গতি আসবে।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মোঃ নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, উপকূলের মানুষ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। কিন্তু এখনো উপকূলের জন্য আলাদা ও সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, নদীভাঙন, বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি ও কর্মসংস্থানের মতো সমস্যাগুলো একেকটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। একটি পৃথক উপকূলীয় মন্ত্রণালয় গঠন করা গেলে উপকূলের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবভিত্তিক হবে এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মিজ তাছলিমা আক্তার বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তবতা দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দুর্যোগ মোকাবিলা, পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে উপকূল উন্নয়নে নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ বলেন, উপকূলের মানুষ শুধু দুর্যোগের সময় আলোচনায় আসে, কিন্তু স্থায়ী উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে। তিনি বলেন, উপকূলের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা হলে বাঁধ নির্মাণ, নদী শাসন, আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমি ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় চিফ হুইপ আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম মণি বলেন, উপকূল বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে এই অঞ্চল। তিনি বলেন, উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ, নদী খনন, নিরাপদ পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। এ জন্য উপকূলভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। একটি পৃথক উপকূলীয় মন্ত্রণালয় গঠন করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয় ও বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলনির্ভর দেশে উপকূল ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় উপকূলের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি এবং উপকূলের কোটি মানুষের ন্যায্য প্রত্যাশা।