নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সদরের গয়নাঘাট খাল পুনঃখনন প্রকল্প ঘিরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, খাল খননের নামে সরকারি অর্থ অপচয় করা হচ্ছে, যা কৃষকদের কোনো কাজে আসবে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় ও সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গয়ানাঘাট খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা ও পলি জমে খালটির প্রস্থ সংকুচিত হয়ে নাব্যতা হারিয়ে এটি ভরাট হয়ে পড়ে।

১৯৯৮-১৯৯৯ অর্থবছরে কৃষকদের চাষাবাদের সুবিধায় খালের মুখে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রায় ত্রিশ হাজার কৃষকের বোরো চাষ বন্ধ হয়ে যায় বলেও জানান তারা।

ফলে কৃষকরা প্রাথমিক সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচ ব্যবস্থায় বোরো চাষ চালিয়ে গেলেও উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়রা খালটি পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছিলেন, উল্লেখ করেন তারা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দুই হাজার চব্বিশ সালের পাঁচ আগস্টের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু আবদুল্লাহ খান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা খালটি পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনের পর খাল পুনঃখনন ও অপরিকল্পিত স্লুইসগেট অপসারণের জন্য নব্বই দশমিক পঁচিশ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় বলেও জানায় সূত্রটি।

সূত্রটি জানায়, পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত সরকার প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির আওতায় পাঁচশ মিটার দৈর্ঘ্য, বত্রিশ ফুট প্রস্থ ও ছয় ফুট গভীরতার একটি প্রকল্প তেইশ লক্ষ টাকায় অনুমোদন দেয়। এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বরিশালের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নুরুল আমিন। গত পনেরো মে থেকে খনন কাজ শুরু হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র আরও জানায়, স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম দেখা দেয়। খালের দুই পাড়ের আবর্জনা খালের মধ্যেই ফেলা হচ্ছে এবং খননের মাটি পাশেই রাখা হচ্ছে, যা সামান্য বৃষ্টিতেই আবার খালে নেমে ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এর পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ও অর্থশালীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করেই খাল খনন করা হয়েছে।

সরেজমিনে শনিবার গিয়ে দেখা যায়, খালের মুখের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়নি। খাল খনন করা হলেও শুরুতেই মুখে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত রয়েছে।

আরও দেখা যায়, কোনো কোনো স্থানে অবৈধ স্থাপনা রেখেই মূল খালের এক পাশ খনন করা হয়েছে এবং মাটি খালের পাশেই রাখা হয়েছে, যা সামান্য বৃষ্টিতেই আবার খালে নেমে ভরাট হয়ে যাবে।

উত্তর বিজয়পুর গ্রামের আমজাত হোসেন ঝিন্টু (আটচল্লিশ) অভিযোগ করে বলেন, গয়ানাঘাট খালটি পুনঃখননের নামে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। কৃষকদের ভাগ্য বদলের নামে ঠিকাদারের আর্থিক ভাগ্য বদল হয়েছে। তিনি আরও বলেন, খালটি গভীর না করে দুই পাশ ঘষামাজা করা হয়েছে।

একই গ্রামের মোরশেদা বেগম অভিযোগ করেন, ঠিকাদার খাল খননে চরম স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন। প্রভাবশালীদের পাকা ভবনসহ অবৈধ স্থাপনা রেখে খনন কাজ করা হয়েছে।

কয়েকজন সুবিধাভোগী জানান, বিষয়টি গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানানো হলে বুধবার ইউএনও ইব্রাহীম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে খালটি পরিদর্শন করেন।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরুল আমিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে তদারকির দায়িত্বে থাকা আনোয়ার হোসেন হেমায়েত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় এবং স্থাপনা ভাঙা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রুবেল হোসেন বলেন, অনিয়মের বিষয়টি নজরে এসেছে। প্রকল্পটি চলমান রয়েছে এবং পাওয়া ত্রুটি সংশোধনের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।