তরিকুল ইসলাম, ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব সাধারণত অফিসকেন্দ্রিক বলেই ধরা হয়। কিন্তু ভাণ্ডারিয়া উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ হাসিবুল হাসানের কর্মকাণ্ড সেই প্রচলিত ধারণাকে অনেকটাই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই মাঠভিত্তিক প্রশাসন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনস্বার্থে ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি ভাণ্ডারিয়ার মানুষের কাছে একটি পরিচিত ও আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

কর্মঘণ্টা কিংবা সরকারি ছুটির সীমাবদ্ধতায় নিজেকে আবদ্ধ না রেখে তিনি প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। কখনো পরিচ্ছন্নতা অভিযানে, কখনো অবৈধ দখল উচ্ছেদে, কখনো গভীর রাতে নদীপথে অভিযান পরিচালনায়, আবার কখনো সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। ফলে উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ভাণ্ডারিয়া গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। সরকারি ছুটির দিনেও বিভিন্ন সড়ক, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাজার ও জনসমাগমস্থলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে তাঁর সরাসরি উপস্থিতি স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শুধু নির্দেশনা দিয়ে নয়, মাঠে থেকে পুরো কার্যক্রম তদারকি করার প্রবণতা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও উদ্বুদ্ধ করছে।

পরিবেশ ও নদী রক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গভীর রাতে স্পিডবোটে নদীতে নেমে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ শিকার এবং বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনা নিধনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে জব্দ করা অবৈধ জাল ধ্বংসের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ রেণু পোনা নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি ভাণ্ডারিয়া ওভারব্রিজ এলাকায় সারারাত চেকপোস্ট পরিচালনা করে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনা উদ্ধার এবং তা নদীতে অবমুক্ত করার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রশাসনের এমন উদ্যোগে অবৈধ রেণু পোনা পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা পৌঁছে যায়।

শুধু নদী রক্ষাই নয়, সরকারি সম্পদ উদ্ধারে তাঁর অবস্থানও দৃশ্যমান। ভাণ্ডারিয়া-বরিশাল আঞ্চলিক সড়কের বটতলা এলাকায় সরকারি খাল ও সড়কের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ পাকা দেয়াল ও দোকানঘর উচ্ছেদ করে উপজেলা প্রশাসন। দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নেওয়া এ পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থান স্পষ্ট করে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ইউএনও মোঃ হাসিবুল হাসানের তৎপরতা লক্ষণীয়। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষার মানোন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতাল ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার মান পর্যবেক্ষণ, রোগীদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার খোঁজ নেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছেন। সরকারি সেবাগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও তাঁর নিয়মিত তদারকি স্থানীয়দের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

এছাড়া বাজার তদারকি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সরকারি জমি উদ্ধার, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমেও নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন তিনি। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বাস্তবতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাসিবুল হাসান বলেন, সরকারি দায়িত্ব শুধু অফিসে বসে পালন করার বিষয় নয়। মানুষের সমস্যা যেখানে, প্রশাসনের উপস্থিতিও সেখানে থাকা প্রয়োজন। ভাণ্ডারিয়ার পরিবেশ রক্ষা, সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ, নদী ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং জনসেবার মান উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়েই একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ভাণ্ডারিয়া গড়ে তুলতে চাই।

স্থানীয়দের অনেকের মতে, ভাণ্ডারিয়ায় অতীতেও দক্ষ ও সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একজন ইউএনওকে এত ঘন ঘন মাঠপর্যায়ে সরাসরি উপস্থিত থেকে জনস্বার্থে কাজ করতে খুব কমই দেখা গেছে। তাঁর কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

একজন সরকারি কর্মকর্তার মূল্যায়ন হয় তাঁর কাজের স্থায়ী প্রভাবের মাধ্যমে। সেই বিচারে সময়ই চূড়ান্ত উত্তর দেবে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই ইউএনও মোঃ হাসিবুল হাসান যেভাবে মাঠে নেমে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন, তাতে ভাণ্ডারিয়ার প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। তাঁদের প্রত্যাশা, এই কর্মধারা অব্যাহত থাকলে সুশাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসেবার ক্ষেত্রে ভাণ্ডারিয়া আরও ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষী হবে।