নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রবেশপত্রে বিষয়ের নাম ও কোডের অসংগতির কারণে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পরেছেন এক শিক্ষার্থী। একটি প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ভুলের কারণে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পরেছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। ওই উপজেলার উলানিয়া মুজাফফর খান ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী রিপা দেওয়ান সোমবার (১৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে এ ঘটনার শিকার হয়েছেন। রিপা দেওয়ান মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের পূর্বহর্ণী গ্রামের দিনমজুর ইদ্রিস আলী দেওয়ানের মেয়ে।

 

জানা গেছে, সরকারি পাতারহাট রসিক চন্দ্র মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষা দিতে উপস্থিত হয় রিপা। অন্যান্য পরীক্ষার্থীর মতো প্রবেশপত্র জমা দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেখতে পান, তার অ্যাডমিট কার্ডে যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের পরিবর্তে সমাজকল্যাণ বিষয়ের নাম ও কোড উল্লেখ রয়েছে। অথচ তিনি যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করে সারা বছর সেই বিষয়েই ক্লাস, টেস্ট পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।

 

বোর্ডের বিধিমালা অনুযায়ী প্রবেশপত্রে উল্লেখিত বিষয় ও কোডের সঙ্গে পরীক্ষার বিষয় মিল না থাকায় কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে না পেরে কান্না করতে করতে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছের নিচে বসে পরেন রিপা। উপস্থিত অভিভাবক ও স্থানীয়দের অনেকেই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভেঙে পরেন রিপা।

 

শিক্ষার্থী রিপা দেওয়ান বলেন, আমি যুক্তিবিদ্যা বিষয়েই রেজিস্ট্রেশন করেছি। কলেজের টেস্ট পরীক্ষাও ওই বিষয়েই দিয়েছি। পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে অ্যাডমিট কার্ড হাতে পাই। তখন বিষয় পরিবর্তনের বিষয়টি খেয়াল করিনি। সমাজকল্যাণের বইও কিনিনি, পড়াশোনাও করিনি। আজ পরীক্ষা দিতে এসে জানতে পারলাম প্রবেশপত্রে অন্য বিষয়ের নাম। এখন বাবা-মায়ের কাছে কীভাবে মুখ দেখাব? কলেজের দায়িত্বশীল শিক্ষকরা বিষয়টি আগে যাচাই করলে আজ আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।

 

তিনি আরও বলেন, একটি ভুলের জন্য আমার পুরো একটি বছর নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত সমাধান চাই।

 

রিপার বাবা ইদ্রিস আলী দেওয়ান বলেন, আমি একজন দিনমজুর। অনেক কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছি। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও তার পড়াশোনা বন্ধ করিনি। অথচ একটি ভুলের কারণে আজ আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যারা এই ভুলের জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি আমার মেয়ের যেন শিক্ষাজীবন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

 

একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা অপর এক পরীক্ষার্থীর মা আখি চৌধুরী বলেন, আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে পেরেছে, কিন্তু রিপাকে কান্না করতে করতে কেন্দ্র থেকে বের হতে দেখেছি। বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একটি ভুলের দায় কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ন্যায়সংগত সমাধান করা।

 

পরীক্ষা কেন্দ্রের আহবায়ক মামুনুর রশীদ বলেন, আজ যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ডে সমাজকল্যাণ বিষয়ের নাম ও কোড উল্লেখ ছিল। বোর্ডের বিধি অনুযায়ী এ ধরনের অসংগতি থাকলে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রের নেই। এছাড়া শিক্ষার্থী তার রেজিস্ট্রেশন কার্ডও সঙ্গে আনেনি।

 

এ বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রিয়াজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো প্রশাসনিক, কারিগরি বা প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

এদিকে একটি সামান্য ভুলের কারণে একজন শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের আরও সতর্কতা থাকলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে তারা শিক্ষা বোর্ডের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।