ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া রেজোলিউশন তৈরি, আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষকদের মানসিকভাবে হয়রানি এবং নারী শিক্ষকের পোশাক নিয়ে প্রকাশ্যে কটূক্তিসহ একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের পর সরেজমিনে তদন্ত করেছেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান।

একাধিক সহকারী শিক্ষকের স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে বিদ্যালয়ে যান ইউএনও। সেখানে তিনি অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযোগের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। তদন্তকালে শিক্ষকেরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক হয়রানি এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।

বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক সেলিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক তাকে প্রকাশ্যে পোশাক নিয়ে কটূক্তি করার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে মানসিক হয়রানি করে আসছেন। একই সঙ্গে তার অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখার অভিযোগও করেন তিনি। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানসিক কষ্টে রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রশিদ ও যথাযথ ভাউচার ছাড়াই বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার যথাযথ হিসাবও উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

এছাড়া সহকারী শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো শিক্ষক স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা এবং সামাজিকভাবে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও করেছেন তারা।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া রেজোলিউশন ও বিভিন্ন নথিপত্র তৈরি করে শিক্ষকদের হয়রানি করা হয়েছে। শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের কাছ থেকেও হুমকি-ধামকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলমের স্বাক্ষর জাল করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ওই মামলার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রায় পাঁচ মাস ধরে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার অভিযোগও করেছেন তারা। সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের সুযোগ দেখিয়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ফারজানা আক্তার নিপা নামের একজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ওই কোচিং কার্যক্রম থেকে প্রধান শিক্ষক নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে গ্রহণ করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা একটি মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত শেষে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী শিক্ষকরা। তবে এ সংক্রান্ত নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা অধিকতর তদন্তে যাচাই করা হবে।

বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ নিয়েও অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যালয়ে জমা হওয়া টিউশন ফি ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজ বাসায় নিয়ে যান। পরে নিজের সুবিধামতো ভাউচার তৈরি করে সহকারী শিক্ষকদের দিয়ে তাতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিদ্যালয়ের অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে না রেখে প্রধান শিক্ষক নিজের একক নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয়ের অর্থ জমা ও উত্তোলনের বিষয় এবং অর্থ ব্যয়ের হিসাব শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, টেস্ট পরীক্ষায় পাঁচ, ছয় বা সাত বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি ও আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং করানোর নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, কোচিং কার্যক্রমে যুক্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করে পুরো অর্থের ব্যবস্থাপনা প্রধান শিক্ষক নিজেই করেছেন।

বিদ্যালয়ের সংস্কার, প্রচার ও অন্যান্য কাজের কথা বলে শিক্ষকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের যথাযথ হিসাব বা ব্যবহার দেখানো হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। পাশাপাশি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সহকারী শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একাধিক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান তদন্তকালে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি বলে জানা গেছে। এ সময় তিনি জানান, অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান জানান, শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন তদন্তকালে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি জানান, গঠিত কমিটি অভিযোগগুলোর বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।