নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানির তোড়ে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়ককের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন, গর্ত ও খানাখন্দ। গত দুই মাসের বৃষ্টিতে বরিশাল বিভাগে পাকা ও কাঁচা মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত ও মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

যার মধ্যে ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা সড়ক ও প্রায় ৯০০ কিমি রয়েছে পাকা সড়ক। জাতীয়, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়ক ১১৯ কিমি এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩৫ কিমি সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়কের অনেক অংশে ইট-বালু দিয়ে সাময়িক সংস্কার করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই ফের তৈরি হচ্ছে গর্ত। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রী ও চালকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের অবস্থা নাজুক। সাময়িকভাবে ইট-বালু ফেলে সংস্কার করা অংশও সপ্তাহ না ঘুরতেই আবার গর্ত ও খানাখন্দে পরিণত হচ্ছে।

মহাসড়কের টরকী বন্দর, শানুহার, গৌরনদী, ইচলাদী ও জয়শ্রীসহ বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড, রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড, দপদপিয়া সেতু ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত দেখা গেছে। এসব স্থানে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।

সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় সহপাঠী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর।

একই দুর্ঘটনায় নিহত কলেজছাত্র রিফাতের স্বজনরাও বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের বাকেরগঞ্জ অংশ অবরোধ করেন। গত ৯ আগস্ট দপদপিয়া সেতু এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত ও একজন আহত হন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন ও অবরোধ প্রত্যাহার করা হলেও সড়কের বেহাল দশা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

দপদপিয়া সেতুর দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের একটি অংশে ইট-বালু দিয়ে সাময়িক সংস্কার করতে দেখা গেছে। বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলা এ কাজে সরকারি দপ্তরের একজন গাড়িচালককে কাজটি দেখভাল করতেও দেখা যায়।

জিএম পরিবহনের চালক মো. হাফিজ বলেন, ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত মহাসড়কের অধিকাংশ অংশই খানাখন্দে ভরা। এসব সড়কে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। সড়কের মাঝে বড় বড় গর্ত থাকায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটের বাসচালকরাও জরাজীর্ণ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত ও ভাঙন থাকলেও স্থায়ীভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) ও সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন ৩৫৩ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কের মধ্যে প্রায় ১১৯ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সড়ক ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশনে বিলম্ব এবং ত্রুটিপূর্ণ বা অপর্যাপ্ত সংস্কারের কারণে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও যানবাহনচালকেরা। অনেক সড়কে গর্ত ও ভাঙন তৈরি হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া এবং উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল থেকে পানি সম্পূর্ণ অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত সড়কের স্থায়ী সংস্কার করা কঠিন। আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ইট-বালু দিয়ে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে।

বরিশাল সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাসুদ খান বলেন, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো স্থায়ীভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে বরিশাল বিভাগে ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। সড়কের বেহাল অবস্থার সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা যুক্ত হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু ইট-বালু দিয়ে সাময়িক সংস্কার না করে সড়কের ভাঙন ও পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও সেতু চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করা না হলে দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন এই রুটের সাধারণ যাত্রী ও চালকরা।