নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: ২৯ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টা। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে দিয়ে রিকশা করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। হঠাৎ করে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এমন ঘটনা আরও ঘটেছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে। সময়টা একই, ভোরবেলা।

২০২৬ সালের জুনে ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর রিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে পড়ে গুরুতর আহত হন এক নারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোর সোয়া ৪টার দিকে ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার।

একইভাবে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ঢাকার কেরানীগঞ্জে ভোরের দিকে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মো. নয়ন (২৫)। ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে তার অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া, ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ঢাকার আশপাশের এলাকায় ভোরে কর্মস্থলমুখী শ্রমিক ও পেশাজীবী মানুষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

২০২৫ সালে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় এক পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাত করা হয়। একই বছর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে হানিফ নামে একজন নিহত হন।

এসব ঘটনায় বোঝা যায়, ঢাকা শহরে ভোরবেলা নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই সঙ্গিন এবং এই সময়ে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া থাকে। ইতোমধ্যে অনেক মানুষের প্রাণ গেছে ছিনতাইকারীদের হাতে।

কেন ‘ভোররাত থেকে সকাল’ পর্যন্ত সময়টাতে ঝুঁকি বেশি?আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে ঢাকায় ভোরবেলা অবাধ ছিনতাইয়ের কয়েকটি কারণ সামনে উঠে এসেছে।

প্রথমত, মধ্যরাতের পর থেকে সকাল পর্যন্ত রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। ২০২৩ সালে মনিরুজ্জামান হত্যার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছিল, রাত ২টার পর ঢাকার রাস্তা ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় ছিনতাইকারীরা রাতের শেষ ভাগকে বেছে নেয়।

দ্বিতীয়ত, ভোরে বাস, ট্রেন বা লঞ্চ থেকে নামা মানুষের চলাচল অনুমানযোগ্য এবং নির্দিষ্ট রুটে তারা যাতায়াত করেন। ছিনতাইকারীরা সেটি জানে।

তৃতীয়ত, এ সময় দোকানপাট ও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ কম থাকে। ফলে ছিনতাইকারীদের মধ্যে ধরা পড়ার ভয় কম থাকে।

৪র্থ, ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেলে করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল বর্তমানে বাড়তি কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

ছিনতাইপ্রবণ এলাকা কোনগুলো

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের তথ্য মতে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজার, মালিবাগ রেলগেট, কাকরাইল, মতিঝিল, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, কমলাপুর, বাবুবাজার, রাজারবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, জুরাইন রেলগেট, মিরপুর-১ থেকে টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-৬-এর শিয়ালবাড়ী মোড়, কালশী, বাড্ডা, ভাটারা, বসিলা, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়ক, হাতিরঝিল ও বিমানবন্দর-সংলগ্ন সড়ক ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের নজরে এসেছে।

এলাকাভিত্তিক পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছিনতাই ও সমজাতীয় অপরাধে তেজগাঁও বিভাগ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। এরপর ওয়ারী, মিরপুর, উত্তরা, লালবাগ, গুলশান, মতিঝিল ও রমনা বিভাগের কথা উঠে এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। পাশাপাশি শাহবাগ, মগবাজার, রমনা, মালিবাগ রেলগেট, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, জিগাতলা, নিউমার্কেট, পান্থপথ ও সায়েন্স ল্যাবরেটরিও ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তবে এসব এলাকার সবগুলোকে ভোররাতের ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই, বরং সামগ্রিক ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এসব এলাকার মধ্যে ভোরে বাস-ট্রেন থেকে নামা যাত্রী, কর্মস্থলমুখী মানুষের চলাচল, নির্জন সড়ক এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ রয়েছে— এমন স্থানগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল, ওয়ারী, মিরপুর, বাড্ডা ও ভাটারার মতো এলাকাকে ভোরের সময়ে আলাদা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

ডিএমপির তথ্যভিত্তিক আরেকটি বিশ্লেষণে তেজগাঁও বিভাগে ৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হওয়ার তথ্য এসেছে। একইভাবে মতিঝিলে ৩২টি, মিরপুরে ২৭টি, রমনায় ২৫টি এবং গুলশানে ২১টি হটস্পটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, ছিনতাইয়ের ঝুঁকি শুধু একটি-দুটি নির্জন সড়কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আবাসিক এলাকা, বাজার, পরিবহনকেন্দ্র এবং মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের পথও এর আওতায় রয়েছে।

বছরে ৫ শতাধিক ছিনতাইয়ের মামলা

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা শহরে ছিনতাই সংক্রান্ত মোট ৫৩১টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ জনকে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৭২টি এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে। দুই বছর মিলিয়ে এ সংশ্লিষ্ট মোট মামলা হয়েছে ৭০৩টি এবং এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ জনকে।

ডিএমপির বিভাগভিত্তিক চিত্রে দেখা গেছে, রমনা বিভাগে ২০২৫ সালে ৪১টি মামলা এবং ১৪৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ২০২৬ সালে ১৭টি মামলা এবং ৩৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। লালবাগ বিভাগে ২০২৫ সালে ২৭টি মামলায় ৫৩ জন এবং ২০২৬ সালে ৫টি মামলায় ৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ওয়ারী বিভাগে ২০২৫ সালে ৯৩টি মামলায় ২১৭ জন এবং ২০২৬ সালে ৩৮টি মামলায় ৯৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। মতিঝিল বিভাগে ২০২৫ সালে ১০১টি মামলায় ১৪৪ জন এবং ২০২৬ সালে ২৫টি মামলায় ৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।

এ ছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ২০২৫ সালে ১৪৬টি মামলায় ৫১০ জন এবং ২০২৬ সালে ৩৪টি মামলায় ১৩৮ জন গ্রেপ্তার; মিরপুর বিভাগে ২০২৫ সালে ৫৫টি মামলায় ২১৯ জন এবং ২০২৬ সালে ১৬টি মামলায় ৪০ জন গ্রেপ্তার; গুলশান বিভাগে ২০২৫ সালে ২৭টি মামলায় ৭৩ জন এবং ২০২৬ সালে ২০টি মামলায় ৩১ জন গ্রেপ্তার; উত্তরা বিভাগে ২০২৫ সালে ৪১টি মামলায় ৭৫ জন এবং ২০২৬ সালে ১৭টি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তৎপর হয়েছে পুলিশ, বসছে ৮৯ চেকপোস্ট

ছিনতাই প্রতিরোধে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ও নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির বর্তমান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাজধানীতে ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গত কয়েকদিন থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মধ্যরাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত ছিনতাই প্রতিরোধে ৮৯টি চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ কাজ করছে। প্রতিটি চেকপোষ্টে একজন অফিসারসহ আটজন করে ফোর্স মোতায়েন থাকে।

তিনি জানান, একই সময়ে ডিএমপি প্রতিটি থানা থেকে চার থেকে পাঁচটা মোবাইল পেট্রোল টিম মাতায়েন করছে। তারা ছিনতাই প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি পেট্রোল টিমে একজন অফিসারসহ সাতজন ফোর্স কাজ করছে। এগুলো আমাদের স্বাভাবিক ডেপলয়মেন্টের বাইরে ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা। সম্প্রতি ঢাকা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় শুধু ৮৯টি চেকপোস্ট ও থানাভিত্তিক মোবাইল পেট্রোল টিমে প্রায় ২ হাজার ১১২ থেকে ২ হাজার ৪৬২ জন পুলিশ সদস্য মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঠে থেকে ছিনতাই প্রতিরোধে কাজ করছেন। এর বাইরে ডিএমপির নিয়মিত টহল, পিকেট, ফুড পেট্রোল ও অন্যান্য দায়িত্বে থাকা সদস্যরাও কাজ করছেন।

হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ছিনতাই এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডিএমপির পক্ষ থেকে রাত-দিন সবসময়ই বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে টিম মাঠে কাজ করে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়। পাশাপাশি ফুড পেট্রোল, মোবাইল পার্টি ও পিকেট পার্টি দায়িত্ব পালন করে। তারা বিভিন্ন রিজিয়ন ও গ্রুপে ভাগ হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে।

তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করেন ডিএমপির ডিসি, এডিসি ও এসিরা। কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত মামলা নেওয়া হয় এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়। এগুলো ডিএমপির সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত পুলিশিংয়ের অংশ।